উপদেষ্টারা নিজ নিজ দপ্তরের নিজস্ব জিনিসপত্র গোছাচ্ছেন। অধিকাংশ উপদেষ্টাই জমা দিয়েছেন কূটনৈতিক বা লাল পাসপোর্ট। নতুন পাসপোর্ট নিতে সচিবালয় পাসপোর্ট অফিসে আবেদনও করেছেন। কেউ কেউ পাসপোর্ট পেয়েও গেছেন। কোনো কোনো উপদেষ্টা সম্পদের হিসাবও জমা দিচ্ছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। সচিবালয়ে এখন অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের সুর।
উপদেষ্টারা সরকারি বাসাও গোছাচ্ছেন। দুদিন পরেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মেয়াদ শেষ হলেই ছেড়ে দেবেন দায়িত্ব। কেউ কেউ বাসা ছাড়ার আবেদনও করেছেন বলে উপদেষ্টাদের দপ্তর থেকে জানা যায়।
আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বুধ ও বৃহস্পতিবার (১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি) ছুটি থাকবে। এরপর শুক্র ও শনিবার দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি। সেই হিসেবে বলা যায় মঙ্গলবারই (১০ ফেব্রুয়ারি) শেষ অফিস করবেন উপদেষ্টারা। অনেকে সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন সরকার গঠন হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদে প্রধান উপদেষ্টা ছাড়াও ২০ জন উপদেষ্টা রয়েছেন।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত, শিল্প এবং স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান গত ৩১ জানুয়ারি তার সরকারি বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি তার কূটনৈতিক পাসপোর্টও জমা দিয়েছেন। উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এ তথ্য জানা যায়।
আরও পড়ুনতফসিলের পর যেভাবে চলছে প্রশাসনবিদায়বেলায়ও ‘বিতর্কিত’ সিদ্ধান্ত প্রশাসনেসচিবালয়ে মবের উৎপত্তি, নিয়ন্ত্রণ না করলে নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে: ইফতেখারুজ্জামান
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে রয়েছেন শারমীন এস মুরশিদ। তার একান্ত সচিব (পিএস) তারেক মোহাম্মদ জাকারিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘সোমবার স্যারের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেওয়া হচ্ছে। এরপর সবুজ পাসপোর্ট এর জন্য আবেদন করা হবে। বাসা ছাড়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’মৎস্য ও প্রাণিসস্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতারের সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোহাম্মদ আলী আকবর বলেন, ‘ম্যাডামের কূটনৈতিক পাসপোর্ট ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি কোনো সরকারি বাড়ি নেননি। আর সম্পত্তির হিসাবও জমা দেওয়া হয়েছে।’
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। তার একান্ত সচিব সত্যজিত রায় দাশ বলেন, ‘স্যারের কূটনৈতিক পাসপোর্ট ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে, বাসা ছাড়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’
বাণিজ্য, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা শেখ বশিরউদ্দীন কোনো সরকারি বাড়ি কিংবা গাড়ি নেননি। তিনি এখনো তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেননি। কারণ তিনি জাপান সফরে ছিলেন।
সম্পদের হিসাবের বিষয়ে জানতে চাইলে রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) শেখ বশিরউদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, গত পরশু (শুক্রবার) যখন জাপানের উদ্দেশে রওয়ানা দেই, আমি আমার অফিসকে ফোন করে বলেছি, তারা সম্পদের বিবরণী পাঠিয়ে দিয়েছে। সেটি আমার কাছে হাজির হয়েছে, আমি সেটি সই করে আজ (রোববার) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়ে দেবো।’
সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, উপদেষ্টা কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন, নতুন পাসপোর্টের আবেদনও করেছেন। তিনি কোনো সরকারি বাড়ি নেননি।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সহকারী একান্ত সচিব কামরুন নাহার জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্যার কূটনৈতিক পাসপোর্ট নেননি। সরকারি বাড়িও নেননি। তাই স্যারের এগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয় নেই। আর সম্পদের হিসাব স্যার ইতোমধ্যে জমা দিয়েছেন।’
গত ৩ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেওয়ার বিষয়ে অর্থ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমি দিয়ে দিয়েছি। আমি সাধারণত জরুরি মিটিং ছাড়া কোনো মিটিংয়ে যাই না। সেজন্য আমি দিয়ে দিয়েছি, অনেকেই দিয়ে দিচ্ছে। এটা নিয়ম, দিয়ে দেওয়া।’
তার সঙ্গে তার স্ত্রীর পাসপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান সালেহউদ্দিন আহমেদ।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম সরকারি বাড়ি নেননি। তিনি তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট ইতোমধ্যে জমা দিয়েছেন বলে তার দপ্তর থেকে জানা যায়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ, রেল, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান তার পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। বাসা ছাড়ারও প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
ধর্ম উপদেষ্টার দায়িত্বে আছেন ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। তার দপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, উপদেষ্টা তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। সচিবালয়ের দপ্তরে থাকা নিজের বইপত্রসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছাচ্ছেন। দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরই বাসা ছেড়ে দেবেন। ঢাকায় তার কোনো বাসা নেই। মেয়াদ শেষে তিনি চট্টগ্রামে চলে যাবেন।
আরও পড়ুনশেষ সময়ে আমলাদের বিরুদ্ধে উপদেষ্টারা সরব কেন?আমলারা তো বঞ্চিত নন, তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা কেন?কে হতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, কার পক্ষে কত শতাংশ জনমত
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে আছেন ফারুক ই আজম। তার দপ্তর থেকে জানা যায়, তিনি ইতোমধ্যে তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে দিয়েছেন। সবুজ পাসপোর্টও হাতে পেয়েছেন। ফ্ল্যাটও গুছিয়ে রাখছেন। উপদেষ্টা হওয়ার আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন। মেয়াদ শেষে তিনি সেখানেই চলে যাবেন বলে তার দপ্তর থেকে জানা যায়।
মঙ্গলবারের পর উপদেষ্টারা আগামী কয়েকদিন কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন- এ বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। তাদের শেষ অফিস কবে হবে, এটি অনেক উপদেষ্টাই বুঝতে পারছেন না। তারা বলছেন, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে যেভাবে বলা হবে, সে অনুযায়ী কাজ করবেন তারা।
১৯৮২ সালের বাংলাদেশ বরাদ্দ নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি কর্মচারী ও উপদেষ্টাদের বাসা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর দুই মাস পর্যন্ত বাসভবনে থাকতে পারবেন। তবে সন্তানরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত হলে আরও চার মাস পর্যন্ত থাকতে পারবেন। বদলি হলেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হয়। তবে মন্ত্রী বা উপদেষ্টাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি নীতিমালায় উল্লেখ নেই।
অন্যদিকে পাসপোর্ট নিয়ে রয়েছে ‘বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩’ এবং ‘পাসপোর্ট বিধিমালা, ১৯৭৪’। কূটনৈতিক বা ‘লাল’ পাসপোর্ট সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, বিচারপতি, সচিব এবং বিদেশে কর্মরত কূটনীতিকদের জন্য ইস্যু করা হয়। এছাড়া দেশের বাইরে কূটনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বা রাষ্ট্রীয় কূটনীতিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের জন্যও এই ক্যাটাগরির পাসপোর্ট ইস্যু করতে পারে সরকার।
তবে, পদ বা মেয়াদ শেষ হলে এই পাসপোর্ট বাতিল বা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। আন্তর্জাতিক দায়মুক্তি, দ্রুত কাস্টমস চেক ও ভিসা সুবিধাসহ বেশ কিছু সুবিধা পান এ ধরনের পাসপোর্ট বহনকারীরা।
যদিও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই উপদেষ্টাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেওয়ার বিষয়টি কিছুটা বিতর্কের সৃষ্টি করে। ভবিষ্যতে বিদেশ সফরের প্রয়োজন বিবেচনায় সময়মতো ভিসা পেতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের অনেকে আগেভাগেই কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন- পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের এমন বক্তব্যের পর মূলত এটা নিয়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়।
আরএমএম/এএসএ