আহমাদ সাব্বির
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) যখন চল্লিশ বছর বয়সের কাছাকাছি পৌঁছেন, তখন তার জীবনে এক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। তিনি ক্রমে নির্জনতা ও একাকীত্ব পছন্দ করতে শুরু করেন। চারপাশের সমাজব্যবস্থা, মানুষের বিশ্বাসগত অবক্ষয়, অন্যায়-অবিচার ও মূর্তিপূজার ভ্রান্তির মধ্যে থেকেও তিনি ছিলেন স্বভাবগতভাবে পবিত্র, চিন্তাশীল ও সত্যসন্ধানী। এই সত্যের সন্ধানই তাকে টেনে নিয়ে যায় মক্কার অদূরে পাহাড়ঘেরা এক নিঃসঙ্গ আশ্রয়ে—হেরা গুহায়।
হেরা গুহা মক্কা নগরী থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে, প্রায় দুই হাজার ফুট উঁচু এক পাহাড়ে অবস্থিত। গুহাটি লম্বালম্বিভাবে তৈরি, যার মুখ কাবা শরিফের দিকে উন্মুক্ত। গুহার ভেতরের পরিসর খুব বেশি বড় নয়—প্রায় চার ফুট লম্বা, পৌনে দুই গজ চওড়া; একজন মানুষ শুয়ে বা বসে ইবাদতে মগ্ন হওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রকৃতিগতভাবেই এর মেঝে সমতল, যা সেখানে ধ্যান ও ইবাদতের জন্য এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। এই গুহাতেই নবীজি (সা.) দীর্ঘ সময় কাটাতেন—নীরবে, গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে। তিনি কাবার দিকে দৃষ্টিপাত করতেন, সৃষ্টিজগত ও স্রষ্টা সম্পর্কে চিন্তা করতেন, সত্যের আলো খুঁজতেন।
এই সময় আরেকটি আশ্চর্য ঘটনা তার জীবনে ঘটতে শুরু করে। প্রায় ছয় মাস ধরে এমন হতো যে, তিনি রাতে যা স্বপ্নে দেখতেন, দিনের আলোয় ঠিক সেটাই বাস্তবে সংঘটিত হতো। এই স্বপ্নগুলো ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট, সত্য ও অর্থবহ। ইসলামি ঐতিহ্যে একে বলা হয় ‘স্বপ্নে ওহির সূচনা’, যা নবুয়তের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এভাবে আল্লাহ তায়ালা ধীরে ধীরে তাকে এক মহাদায়িত্ব গ্রহণের জন্য মানসিক ও আত্মিকভাবে প্রস্তুত করে তুলছিলেন।
এরপর আসে মানব ইতিহাসের এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। হেরা গুহায় এক রাতে, গভীর নির্জনতায়, হঠাৎ করেই আগমন করেন ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)। তিনি নবীজিকে (সা.) বললেন, ‘পড়ুন!’ নবীজি (সা.) বিস্মিত ও আতঙ্কিত হয়ে উত্তর দিলেন, ‘আমি তো পড়তে জানি না’। ফেরেশতা তাকে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন। এভাবে তিনবার তিনি বলেন, ‘আমি তো পড়তে জানি না’। প্রতিবারই ফেরেশতা তাকে আলিঙ্গন করে একই নির্দেশ দেন, আর নবীজি (সা.) একই উত্তর দেন। অবশেষে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হয় সেই মহিমান্বিত বাণী— ‘পড়ো তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক হতে। পড়ো, এবং তোমার রব বড় মেহেরবান, যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিখিয়েছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন, যা সে জানতো না।
এই কয়েকটি আয়াতের মধ্য দিয়েই সূচিত হয় পবিত্র কোরআনের অবতরণ এবং মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ নবুয়তের মহান দায়িত্ব অর্পিত হয় হজরত মুহাম্মাদের (সা.) ওপর।
এই সময় তার বয়স ছিল চল্লিশ বছর ছয় মাস। কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, এ মহিমান্বিত ঘটনা সংঘটিত হয় রমজান মাসে। গবেষক আলেমদের মতে, এটি ছিল ৬১০ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ আগস্ট। এই মুহূর্তটি শুধু ইসলামের ইতিহাসে নয়, বরং সমগ্র মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে।
এই অভিজ্ঞতা নবীজিকে (সা.) গভীরভাবে আলোড়িত করে তোলে। ফেরেশতার সঙ্গে সাক্ষাৎ, ওহির ভার—সবকিছু মিলিয়ে তিনি প্রচণ্ড ভীত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। হেরা গুহা থেকে ফিরে তিনি সোজা বাড়িতে যান এবং তার সহধর্মিণী হযরত খাদিজার (রা.) কাছে সব ঘটনা খুলে বলেন। হজরত খাদিজা (রা.) ছিলেন এক অসাধারণ প্রজ্ঞাবান, ধৈর্যশীল ও সহানুভূতিশীল নারী। তিনি নবীজিকে (সা.) সান্ত্বনা দিয়ে বলেন—আপনি তো আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অসহায়দের সাহায্য করেন, মেহমানদের সম্মান করেন, সত্য ও ন্যায়ের পথে চলেন। আল্লাহ তায়ালা কখনোই আপনাকে অপমানিত করবেন না বা ক্ষতির মুখে ফেলবেন না। তার এই আশ্বাস নবীজির (সা.) অন্তরে গভীর প্রশান্তি এনে দেয়।
এরপর হযরত খাদিজা (রা.) নবীজিকে (সা.) নিয়ে যান তার এক আত্মীয়, মক্কার খ্যাতনামা তাওরাত ও ইঞ্জিল বিশারদ ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে। ওয়ারাকা ছিলেন এক প্রবীণ পণ্ডিত, যিনি সুরিয়ানি ভাষায় লিখিত ইঞ্জিল আরবিতে অনুবাদ করতেন এবং পূর্ববর্তী নবীদের ইতিহাস সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতেন। নবীজি (সা.) তার কাছে পুরো ঘটনা বর্ণনা করলে ওয়ারাকা বিন নওফাল গভীর মনোযোগ দিয়ে সব শোনেন এবং বলেন—এই সেই ফেরেশতা, যিনি আগে হযরত মুসার (আ.) কাছে ওহি নিয়ে এসেছিলেন। এতে ভয়ের কিছু নেই; বরং আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন।
ওয়ারাকা আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী করেন। তিনি বলেন, হায়! আমি যদি সে সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকতাম, যখন আপনার সম্প্রদায় আপনাকে দেশান্তর করবে। এ কথা শুনে নবীজি (সা.) বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেন—আমার নিজের লোকেরা কি আমাকে বের করে দেবে? ওয়ারাকা উত্তর দেন—হ্যাঁ, ইতিহাস তাই বলে। যিনি এই দায়িত্ব ও সম্মান লাভ করেছেন, তার সাথেই এমন আচরণ করা হয়েছে।
নবুয়াত প্রাপ্তির পর প্রথম তিন বছর নবীজি (সা.) অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। তিনি নিকটবর্তী, বিশ্বস্ত ও সত্যপ্রবণ মানুষদের কাছে আল্লাহর একত্ববাদ তুলে ধরেন। এই সময়ে ইসলামের প্রথম অনুসারীরা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠেন, যারা পরবর্তীতে ইসলামের ইতিহাসে উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হন।
তিন বছর পর আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নির্দেশ আসে—নিকটতম আত্মীয়দের প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার। এই আদেশ পালনের জন্য নবীজি (সা.) প্রথমে নিজের গোত্র বনু হাশেমকে এক ভোজে আমন্ত্রণ জানান। সবাই একত্রিত হলে তিনি তাদের সামনে স্পষ্ট ভাষায় আল্লাহর একত্ববাদ, পরকাল ও নবুয়াতের বার্তা তুলে ধরেন। কিন্তু এই আহ্বানে সবাই সাড়া দেয়নি। বরং তার চাচা আবু লাহাব প্রচণ্ড বিরোধিতা করে সভা ত্যাগ করেন এবং তার প্রভাবেই অন্যরাও সরে যায়।
এই কঠিন মুহূর্তে একমাত্র যে ব্যক্তি দৃঢ়ভাবে নবীজির (সা.) পাশে দাঁড়ান, তিনি হলেন কিশোর আলি (রা.)। অল্প বয়স হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ইসলামের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং নবীজির (সা.) প্রতি নিজের সমর্থন ঘোষণা করেন।
এভাবে হেরা গুহার নির্জন ধ্যান থেকে শুরু করে প্রকাশ্য দাওয়াত পর্যন্ত নবীজির (সা.) জীবনের এই অধ্যায়টি ইসলামের ভিত্তি স্থাপনের এক অনন্য ইতিহাস। এটি শুধু একটি ধর্মীয় ঘটনার বর্ণনা নয়; বরং সত্য, ধৈর্য, সাহস ও মানবকল্যাণের এক চিরন্তন আদর্শ, যা যুগে যুগে মানুষকে আলোর পথ দেখিয়ে চলেছে।
ওএফএফ