ফিচার

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে কীভাবে?

এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে গণভোট। গণভোটে হ্যাঁ ভোট জিতলে দেশে প্রথম সংসদে নিম্নকক্ষের পাশাপাশি গঠিত হবে উচ্চকক্ষ। উচ্চকক্ষ বলতে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার একটি কক্ষকে বোঝায়, অন্য কক্ষটি নিম্নকক্ষ। আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চকক্ষ হিসেবে মনোনীত কক্ষটি সাধারণত ছোট হয় এবং প্রায়শই নিম্নকক্ষের চেয়ে বেশি ক্ষমতা থাকে। এক কক্ষের আইনসভা (যেখানে উচ্চকক্ষ কিংবা নিম্নকক্ষ নেই) সাধারণত এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা নামে পরিচিত।

বাংলাদেশে যদি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয় এবং সেই প্রস্তাবের অংশ হিসেবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালুর বিষয়টি অনুমোদন পায়, তাহলে দেশের সংসদীয় কাঠামোয় একটি বড় পরিবর্তন আসবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে একক কক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যেখানে জাতীয় সংসদই আইন প্রণয়নের একমাত্র কেন্দ্র। কিন্তু গণভোটে জনগণের সমর্থন মিললে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে একটি ‘উচ্চকক্ষ’ বা দ্বিতীয় কক্ষ গঠনের আইনি ভিত্তি তৈরি হবে।

গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’ সূচক হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই প্রতিনিধিরা একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। এর মেয়াদ হবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত।

গণভোটে আসলে একটি প্রশ্ন থাকবে, সেটি যেভাবে থাকবে তা হলো-আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন? হ্যাঁ কিংবা না।

তবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলেই উচ্চকক্ষ সঙ্গে সঙ্গে গঠিত হবে না। প্রথম ধাপে নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে গণভোটের ফলাফল ঘোষণা করবে। এরপর সরকার সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। সাধারণত সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদে নির্দিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হয়। সংশোধনী পাস হয়ে রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়ার পর তা কার্যকর হবে। এরপর উচ্চকক্ষের কাঠামো, সদস্য সংখ্যা, নির্বাচন বা মনোনয়ন পদ্ধতি, মেয়াদ এবং ক্ষমতা নির্ধারণে পৃথক আইন প্রণয়ন করা হতে পারে। এসব প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি কী হবে, তা নির্ভর করবে সংশোধিত সংবিধান ও প্রণীত আইনের ওপর। সম্ভাব্যভাবে সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে পারেন, আবার পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিও থাকতে পারে যেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ভোট দিয়ে সদস্য নির্বাচন করবেন। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ, নারী বা সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে মনোনয়ন ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে। সদস্যদের মেয়াদ সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারিত হয় এবং তারা শপথ গ্রহণের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করেন। উচ্চকক্ষ গঠনের পর সংসদ কার্যত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হয়ে যাবে অর্থাৎ নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) ও উচ্চকক্ষ মিলেই আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

উচ্চকক্ষে থাকবে ১০০টি আসন। এখন ভাবতে পারেন এই আসনে কারা থাকবে। এই আসনে থাকবে সংসদীয় নির্বাচনে জয়ী দলগুলোর প্রার্থী। পিআর পদ্ধতি বা আনুপাতিক হারে বিভিন্ন দল মনোনীত ১০০ সদস্য নিয়ে গঠিত হবে এই সংসদ। সহজ করে বললে, ভোটে কোন দল কত শতাংশ ভোট পেল সেই হিসাবে আসন পাবে। যেমন ধরুন কোনো দল ৪০ শতাংশ ভোট পেল তাহলে ১০০ আসনের ৪০ শতাংশ মানে ৪০টি আসন। যারা ১ শতাংশ ভোট পাবে তাদের সেই হিসাবে ১টি আসন থাকবে। নিম্নকক্ষে আসন না পেলেও উচ্চকক্ষে পাবে।

উচ্চকক্ষের প্রধান কাজ সাধারণত আইন পর্যালোচনা ও পুনর্বিবেচনা করা। সাংবিধানিক সংশোধনী, গুরুত্বপূর্ণ আইন সংশোধনী ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের বিশেষ ক্ষমতা থাকবে। তবে উচ্চকক্ষ সরকারের ওপর অনাস্থা আনতে পারবে না। তবে তারা সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে। এছাড়া উচ্চকক্ষের আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে প্রান্তিক কণ্ঠস্বর তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। দুই কক্ষের মধ্যে কোনো মতবিরোধ দেখা দিলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের বিধান রাখা হয়েছে।

নিম্নকক্ষে পাস হওয়া বিল উচ্চকক্ষে পাঠানো হলে সেখানে তা নিয়ে আলোচনা, সংশোধনী প্রস্তাব বা মতামত দেওয়া হতে পারে। এতে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়। অনেক দেশে উচ্চকক্ষ সরাসরি সরকার গঠন বা বাজেট প্রণয়নে ভূমিকা না রাখলেও নীতিগত বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। এর উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা এবং বিভিন্ন অঞ্চল, পেশাজীবী বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশে নতুন হলেও ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, উচ্চকক্ষের ধারণা বহু পুরোনো। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ‘হাউস অব লর্ডস’ এবং ‘হাউস অব কমন্স’ এই দুই কক্ষের ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের দুটি অংশ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ও সিনেট যেখানে সিনেট উচ্চকক্ষ হিসেবে কাজ করে। ভারতেও লোকসভা (নিম্নকক্ষ) ও রাজ্যসভা (উচ্চকক্ষ) রয়েছে। এসব দেশে উচ্চকক্ষ মূলত আইন প্রণয়নে ভারসাম্য ও পর্যালোচনার ভূমিকা পালন করে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা বিদ্যমান, যদিও বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে একক কক্ষের সংসদই বজায় রেখেছে।

বাংলাদেশে উচ্চকক্ষ চালুর আলোচনা বিভিন্ন সময় উঠলেও তা কখনো বাস্তবায়িত হয়নি। যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি সমর্থন দেন, তাহলে এটি হবে দেশের সংসদীয় ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়। তবে বাস্তবায়নের গতি নির্ভর করবে রাজনৈতিক ঐকমত্য, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং আইন প্রণয়নের দক্ষতার ওপর। উচ্চকক্ষ কার্যকরভাবে কাজ করতে পারলে এটি আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে আরও পরিপক্ব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে পারে; আবার সঠিক কাঠামো না হলে এটি ব্যয় ও জটিলতা বাড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুনইতিহাসে বিশ্ব নেতাদের আলোচিত উত্থান, পতন ও পরিসমাপ্তিযে দেশে প্রার্থী একজন হলেও ভোট পড়ে শতভাগ

কেএসকে