পবিত্র রমজান প্রায় আসন্ন। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও মুসলিমরা এ মাসে রোজা রাখবেন। রমজান শুরুর আগেই তাঁদের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। অনেকেই রমজান শুরুর আগে এ বিষয়ে সচেতন হন। তখন কোনো শারীরিক সমস্যা বা অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে শোধরানোর সুযোগ থাকেনা। যারা দীর্ঘমেয়াদি বা অসংক্রামক রোগে ভোগেন, তাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও রোজা রাখতে অনেকেই প্রবল আগ্রহী। তারা যদি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোজার মাসের জন্য ঔষধ বিধি ঠিক করে নিতে পারেন, তবে সহজেই রোজা রাখতে পারবেন। এতে রোজা ভাঙ্গার বা রোজা থেকে বিরত থাকার কোন প্রয়োজন হয়না।
ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের অন্যতম স্তম্ভ রমজানের রোজা। শুধু আত্মশুদ্ধিরই নয়, এ মাস আত্মনিয়ন্ত্রণেরও। রোজার অন্যতম লক্ষ্য মানুষের স্বাস্থ্যগত উন্নতি সাধন। রোজা রাখলে অনেকে স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় করেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রোজায় কারও স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে গেছে বা রোজা রেখে ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে কারও মৃত্যু হয়েছে এমন কোনো ঘটনার কথা শোনা যায়নি। রোজা কষ্টকর ইবাদত এবং রোজার দ্বারা শরীরে চাপ পড়ে বলে অনেকেই রোজা ছেড়ে দেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া রোজা পরিত্যাগ করা সম্পূর্ণ অনুচিত। সুস্থ ব্যক্তি তো বটেই, অনেক অসুস্থ ব্যক্তিরও রোজা ছেড়ে দেওয়া উচিত হবে না।
মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে রোজাদারের জন্য রয়েছে দৈহিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধন, আত্মিক ও নৈতিক অবস্থার উন্নতিসহ অশেষ কল্যাণ ও উপকার লাভ করার সুযোগ। রোজা মানুষকে সংযমী ও শুদ্ধ করে এবং অশ্লীল-মন্দ থেকে বিরত রাখে। আর সেজন্যই প্রত্যেক মোমিন মুসলমান, সুস্থ অথবা রোগাক্রান্ত, সবাই রোজা রাখতে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চান। তবে রোগীরা রোজা রাখবেন কি রাখবেন না, প্রায়ই তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। অবশ্য কী কী অবস্থায় রোজা রাখা যাবে বা যাবে না, তার সুস্পষ্ট বিধান শরিয়তে আছে। আবার সুনির্দিষ্ট কারণে রোজা না রাখতে পারলে তার পরিবর্তে ক্ষতিপূরণ স্বরূপ কাজা, কাফফারা, ফিদিয়া বা বদলি রোজা রাখার সুস্পষ্ট ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তারপরও রোজা পালনে যে আনন্দ, অনুভূতি, আত্মিক পরিতৃপ্তি, এর সঙ্গে সংযম, কুপ্রবৃত্তি দমন, লোভ-লালসা, হিংসা, প্রতিহিংসা ইত্যাদি ত্যাগ করার যে আলোকোজ্জ্বল আমেজ-অনুভূতির চর্চা হয়, তা রমজানের রোজা ছাড়া অন্য কোনোভাবে লাভ করা যায় না।
রোজার মাসে পেপটিক আলসার রোগীরা খালি পেটে থাকবেন, ডায়াবেটিস রোগীরা কীভাবে রোজা রেখে ইনসুলিন নেবেন, উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা কীভাবে দুবেলা বা তিনবেলা ওষুধ সেবন করবে, এ ছাড়া হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের রোগী, কিডনি বা হার্টের রোগী, লিভার, চোখ, কান বা নাকের রোগী রোজা রাখবেন কিনা এসব চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েন।
আবার কিছু কিছু অসুস্থ ব্যক্তি এমনকি সুস্থ ব্যক্তিরাও দুর্বলতা এবং নানারকম দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনার কারণে রোজা রাখতে গড়িমসি করেন। আসলে রোজা রাখলে শরীরে তেমন কোনো বিরূপ প্রভাব পড়েনা। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুচিন্তিত অভিমত হলো, রোজা স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি তো করেই না, বরং শরীর ও মনের উন্নতি লাভের সহায়ক। পেপটিক আলসার, ডায়াবেটিস, হৃদরোগী, যাদের অতিরিক্ত ওজন ও শরীরে চর্বি বা কোলেস্টেরল পরিমাণ বেশি এবং বাত ব্যথার রোগীরাও সরাসরি রোজায় উপকার পান। যারা ধূমপান ও নেশাজাতীয় দ্রব্য ব্যবহার করেন, রোজায় এগুলো পরিহার করার সুবর্ণ সুযোগ। এর ফলে ক্যান্সার, হৃদ্রোগ রোগ, স্ট্রোকসহ বহু জটিল রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
রুটিন চেকআপ ও চিকিৎসকের পরামর্শ: যারা জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত যেমন- ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, হাঁপানি, লিভার বা কিডনির রোগ, থাইরয়েডের সমস্যা বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ আছে, তারা রমজান শুরুর আগেই চিকিৎসকের পরামর্শে একটি রুটিন চেকআপ সেরে ফেলুন।
মানুষের রোগের শেষ নাই, ধরনও এক নয়। তাই কোনো রোগী যারা রোজা রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অথচ দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভোগেন, তাদের উচিত ইসলামী জ্ঞান সম্পন্ন ডাক্তার বা আলেম-ওলামার সাথে পরামর্শ করে রোজার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া। মনে রাখতে হবে, নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগে কিংবা সামান্য অসুস্থতায় রোজা রাখতে কোনো নিষেধ নাই। বরং রোজা রোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তবে তীব্র অসুস্থতায় কিংবা জটিল রোগে রোজা রাখা ঠিক হবে না, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন সংশ্লিষ্ট ইসলামী জ্ঞান সম্পন্ন চিকিৎসক।
(১) সাধারণত রুটিন চেকআপে রক্তের সুগার, কিডনির অবস্থা বুঝতে ক্রিয়েটিনিন ও প্রস্রাবে অ্যালবুমিন, লিভারের জন্য এসজিপিটি, রক্তের সিবিসি, ইলেকট্রোলাইট, লিপিড প্রোফাইল, ফুসফুসের রোগীদের প্রয়োজনে এক্স–রে, হৃদ্রোগীদের ক্ষেত্রে ইসিজি করা হয়ে থাকে।
(২) পরীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী আপনার নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিন। কারণ পুরোনো ওষুধের ডোজ পরিবর্তন বা কোনো নতুন ওষুধের সংযোজন দরকার হলে তা শরীরের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার যথেষ্ট সময় পাবেন এতে।
(৩) ডায়াবেটিক রোগীরা রমজানে ইনসুলিনের বা খাবার ওষুধের মাত্রা কেমন হবে, ভালোভাবে জেনে নিন। রক্তচাপ, হৃদ্রোগী, হাঁপানি, কিডনি বা লিভার ও অন্যান্য রোগীরা নিয়মিত ওষুধের রোজাকালীন ব্যবহারের সময়সূচিও জেনে নিন।
চিকিৎসকের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরামর্শ করুন:ডায়াবেটিক রোগী : রোজা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রোগীদের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ ও রহমতস্বরূপ। ডায়াবেটিক রোগীরা সঠিক নিয়মে রোজা রাখলে নানা রকম উপকার পেতে পারেন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূল উপায় হলো খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, আর রোজা রাখা হতে পারে এক অন্যতম উপায়। এতে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ সহজ ও সুন্দরভাবে করা যায়।
রক্তের কোলেস্টেরল: যাদের শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, রোজা তাদের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সহায়তা করে। ।
অতিরিক্ত ওজন: যাদের ওজন অতিরিক্ত, তাদের ক্ষেত্রে রোজা ওজন কমানোর জন্য এক সহজ ও সুবর্ণ সুযোগ। ওজন কমে যাওয়ায় বিভিন্ন রোগ থেকে বেঁচে থাকা যায় যেমন উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগসহ শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, বাতের ব্যথা, অস্টিওআরথ্রাইটিস, গাউট ইত্যাদি। আবার ওজন কমাতে পারলে কোলেস্টেরলের মাত্রাও কমে আসে।
হৃদরোগ এবং উচ্চ রক্তচাপ: রোজার মাধ্যমে ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ হওয়ার ফলে যারা হৃদরোগে অথবা উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন, তাদের জন্য রোজা অত্যন্ত উপকারী। এতে শরীরের বিশেষ করে রক্তনালির চর্বি হ্রাস পায়, রক্তনালির এথারোসক্লেরোসিস কমাতে সাহায্য করে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
পেপটিক আলসার ও পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা: যারা পেটের বিভিন্ন সমস্যায় ভোগেন যেমন পেপটিক আলসার, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য, আই.বি.এস, জি.আর.ডি., তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাওয়া দাওয়াসহ ঔষধপত্রের ব্যবস্থা জেনে নিন। একসময় ধারণা ছিল, পেপটিক আলসারে আক্রান্ত রোগীরা রোজা রাখতে পারবেন না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসব ধারণা ঠিক নয়। রোজায় নিয়ন্ত্রিত খাওয়া-দাওয়ার ফলে অ্যাসিডের মাত্রা কমে যায়। তাই সঠিকভাবে রোজা রাখলে এবং সঠিক খাবার দিয়ে সাহরি ও ইফতার করলে রোজা বরং আলসারের উপশম করে, অনেক সময় আলসার ভালো হয়ে যায়।
শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমা রোগী: যারা এইসব রোগে ভোগেন, তাদেরও রোজা রাখতে কোনো অসুবিধা নেই। রোজায় এ ধরনের রোগ সাধারণত বাড়ে না, বরং চিন্তামুক্ত থাকা এবং আল্লাহর প্রতি সরাসরি আত্মসমর্পণের ফলে এই রোগের প্রকোপ কমই থাকে। রাতে এক বার বা দু’বার ওষুধ খেয়ে নেবেন, যা দীর্ঘক্ষণ শ্বাস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করবে। প্রয়োজনে ইনহেলার বা নেবুলাইজার ব্যবহার করা যায়।
কিডনি রোগ: যেসব রোগী ক্রনিক কিডনি ফেইলিউরে আক্রান্ত তাদের সুনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতে হয়, নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়, এমনকি পানি খাওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্কতা ও পরিমাণ অনুযায়ী খেতে হয়। তাই রোজা রাখার ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। তবে কিডনি আক্রান্ত রোগীদের শারীরিক অবস্থা যা-ই থাকুক না কেন, সর্বাবস্থায় কিডনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে রোজা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়াই শ্রেয়।
লিভারের অসুখ: লিভারের রোগীদের রোজা রাখা নির্ভর করে রোগটির ধরনের ওপর। কেউ যদি ভাইরাল হেপাটাইটিস নামক রোগে আক্রান্ত হন, তারা খেতে পারেন না, ঘনঘন বমি হয়, রুচি নষ্ট হয়, জন্ডিস দেখা দেয়। অনেক সময় তাদের শিরায় স্যালাইন বা গ্লুকোজ দিতে হয়। তাদের পক্ষে রোজা না রাখাই ভালো। আবার যারা লিভার সিরোসিসে বা ক্রনিক লিভার ডিজিজে আক্রান্ত, তাদের যদি রোগের লক্ষণ কম থাকে তবে রোজা রাখতে পারেন। খারাপ লাগলে রোজা ভেঙে ফেলবেন।
মানুষের রোগের শেষ নাই, ধরনও এক নয়। তাই কোনো রোগী যারা রোজা রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অথচ দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভোগেন, তাদের উচিত ইসলামী জ্ঞান সম্পন্ন ডাক্তার বা আলেম-ওলামার সাথে পরামর্শ করে রোজার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবেন। মনে রাখতে হবে, নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগে কিংবা সামান্য অসুস্থতায় রোজা রাখতে কোনো নিষেধ নাই। বরং রোজা রোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তবে তীব্র অসুস্থতায় কিংবা জটিল রোগে রোজা রাখা ঠিক হবে না, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন সংশ্লিষ্ট ইসলামী জ্ঞান সম্পন্ন চিকিৎসক।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
এইচআর/জেআইএম