দেশজুড়ে

যশোরের ৫ আসনে বিএনপির ভরাডুবির নেপথ্য চার কারণ

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা যশোরের ৬টি আসনের মধ্যে ৫টিই হাতছাড়া হয়েছে বিএনপির। ৫টি আসনেই বড় জয় পেয়েছে জামায়াত। শুধুমাত্র যশোর-৩ সদর আসনে জিতলেও লড়াই করতে হয়েছে বিএনপিকে। এই আসনে জয় পেয়েছেন সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ছেলে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

বিএনপির এমন পরাজয়ের পেছনে চার কারণকে চিহ্নিত করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এগুলো হলো- প্রার্থী মনোনয়নে তৃণমূলকে গুরুত্ব না দেওয়া ও মনোনয়ন পরিবর্তন; অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং মোকাবিলায় ব্যর্থতা; বিএনপি নেতাকর্মীদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং জামায়াতের রাজনৈতিক ও নির্বাচনি কৌশল মোকাবিলায় ব্যর্থতা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোরের ছয়টি আসনের মধ্যে ৫টিতেই জয়লাভ করেছেন জামায়াত প্রার্থীরা। যশোর-১ (শার্শা) আসনে ২৫ হাজারের বেশি ভোটে জিতেছেন জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মাদ আজীজুর রহমান। যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে প্রায় ৩৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন জামায়াতের মোহাম্মদ মোসলেহউদ্দিন ফরিদ। যশোর-৩ (সদর) আসনে ১৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। যশোর-৪ (অভয়নগর-বাঘারপাড়া) আসনে ৪৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতের গোলাম রসুল। যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনের জামায়াতের গাজী এনামুল হক ৪৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপির বিদ্রোহী) অ্যাডভোকেট শহীদ মো. ইকবাল হোসেনকে। যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে ১২ হাজার ভোটে জয় পেয়েছেন জামায়াতের অধ্যাপক মুক্তার আলী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যশোরে পাঁচটি আসনে জয় পেয়ে জেলার রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে জামায়াত। বিপরীতে বিএনপির নড়বড়ে সাংগঠনিক অবস্থাই প্রকাশ পেয়েছে।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, যশোর-১ (শার্শা) আসনে প্রথমে বিএনপির সাবেক দফতর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। মনোনয়ন পেয়ে তিনি কর্মী-সমর্থক নিয়ে প্রায় দেড় মাস গ্রামে গ্রামে ভোটারদের কাছে যান। বিপরীতে মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে মাঠে নামেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান জহির, সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটন ও সাবেক সভাপতি খায়রুজ্জামান মধুর কর্মী-সমর্থকরা। শেষ পর্যায়ে এসে নুরুজ্জামান লিটনকে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। এরপর মফিকুল হাসান তৃপ্তি ও হাসান জহিরের সমর্থকরা অভিমানী হয়ে নির্বাচনে আর ভূমিকা রাখেননি।

দলের একাংশের নেতাদের ধারণা ছিল, মফিকুল হাসান তৃপ্তির মনোনয়ন পরিবর্তন করা হলে ভাগ্য খুলতে পারে হাসান জহিরের। কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়নি নুরুজ্জামান লিটনের। ফলে দলের একাংশের নেতাকর্মীদের মনে অভিমান-ক্ষোভ থেকেই গেছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নিজের অবস্থান শক্ত করেন এবং বিএনপির নিশ্চিত এই আসনটি হাতছাড়া হয়ে যায়।

যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে বিএনপির ৫ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। শুরুতে সাবিরা সুলতানা মুন্নীকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও তা পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করেন অন্য তিন নেতা ও তাদের সমর্থকরা। শেষ পর্যন্ত চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জহুরুল হক বিদ্রোহী প্রার্থীও হন। যদিও পরে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি সরে দাঁড়ান। কিন্তু ততক্ষণে ব্যালটে থেকে যায় তার নাম।

দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, সাবিরা সুলতানার পাশে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের সেভাবে দেখা যায়নি। দুই-একদিন লোকদেখানো মিটিংয়ে থাকলেও ‘ভোট পলিটিক্সে’ তারা তেমন ভূমিকা রাখেননি। এজন্য চৌগাছায় নির্বাচন পরবর্তী একটি সভাতেও সাবিরা সুলতানা মুন্নীর উপস্থিতিতে তৃণমূলের কর্মীরা উপজেলা নেতাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছেন।

যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনে শুরুতে এখানে তৃণমূলের আস্থাভাজন নেতা ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুবকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাঘারপাড়া ও অভয়নগর বিএনপির একাংশ তার ব্যবসায়িক ঋণের বিষয়টি সামনে এনে মনোনয়নপত্র বাতিলে ভূমিকা রাখে। টিএস আইয়ুবও কেন্দ্রীয় এক নেতাকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দেন। এরপর বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মতিয়ার রহমান ফারাজী মনোনয়ন পান। কিন্তু ভোটের দিন দেখা যায়, টিএস আইয়ুবের সমর্থকরা বাঘারপাড়ার সন্তান হিসেবে জামায়াত নেতা গোলাম রছুলকে ভোট দিয়েছেন। ফারাজী নিজের কেন্দ্রেই বিজয় নিশ্চিত করতে পারেননি।

যশোর-৫ মণিরামপুর আসনে পরাজয়ের জন্য দলের সিদ্ধান্তকে দুষছেন নেতাকর্মীরা। প্রথমে এখানে জোটের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি। এখানে একক প্রার্থী ঘোষণায় মাঠে নামে বিএনপি। তৃণমূলের প্রত্যাশা অনুযায়ী শহীদ ইকবালকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে বিএনপি জোট শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি আব্দুর রশিদ বিন ওয়াক্কাসকে ধানের শীষের প্রার্থী ঘোষণা করেন। ফলে দলীয় সিদ্ধান্তের বিপরীতে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহীদ ইকবাল। তাকে দল বহিষ্কার করলেও কাজ হয়নি। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী তার সঙ্গে ছিলেন। ফলে ধানের শীষের প্রার্থীকে সঙ্গী করে একসঙ্গে পরাজয় বরণ করেন শহীদ ইকবাল। ধানের শীষের অবস্থান চলে যায় তৃতীয় স্থানে। বিজয়ী হন জামায়াতের প্রার্থী গাজী এনামুল হক।

যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে প্রথমে মনোনয়ন দেওয়া হয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রওনকুল ইসলাম শ্রাবণকে। কিন্তু ২৪ ডিসেম্বর হঠাৎ শ্রাবণকে বাদ দিয়ে আবুল হোসেন আজাদকে প্রার্থী করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ হন তৃণমূলের কর্মীরা। অবশ্য রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ দলের পক্ষে মাঠে থাকলেও ঘরে ওঠেনি বিজয়।

দলীয় সূত্র আরও জানায়, বিএনপির এমন পরাজয়ের পেছনে প্রার্থী মনোনয়নে তৃণমূলকে গুরুত্ব না দেওয়া ও মনোনয়ন পরিবর্তন প্রধান কারণ বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। এছাড়া প্রত্যেক উপজেলাতেই বিএনপির নেতৃত্বে গ্রুপিং রয়েছে। প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে টানাপড়েন এই গ্রুপিংকে আরও উসকে দিয়েছে। জেলা নেতৃত্বও এই গ্রুপিংয়ের অবসান ঘটাতে পারেননি। এছাড়া নির্বাচনে অন্যতম প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ না থাকায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের অনেকেই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। জেলার অনেক এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা ফেসবুক আর নেতাদের দেখিয়েই প্রচার প্রচারণার ইতি টেনেছেন।

এছাড়াও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরেকটি কারণকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সেটি হলো, জামায়াতের রাজনৈতিক ও নির্বাচনি কৌশল মোকাবিলায় ব্যর্থতা।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বিএনপির সাথে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ জামায়াত ঘর গুছিয়েছে। বিএনপিকে পাশে রেখেই তারা সাংগঠনিক ভিত মজবুত করেছে এবং তৃণমূলে নিজেদের বিস্তৃত করেছে। পাশাপাশি জামায়াত পৌরসভা ও ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইউনিটে শক্তি বৃদ্ধি করে সাংগঠনিক দক্ষতা বাড়িয়েছে। নির্বাচনি মাঠে জামায়াতের এই ইউনিটগুলো বাড়ি-বাড়ি, পাড়া- মহল্লাভিত্তিক ভোটার পর্যালোচনা করে ভোট বাড়িয়েছে। এছাড়া নারী কর্মীদের মাধ্যমে ধর্মীয় লেবাসে ভোটের সুফল ঘরে তুলেছে।

এ প্রসঙ্গে যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, যশোরের ৫টি আসনে বিএনপি প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছে। বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। কেন এই পরাজয় ঘটলো তা অনুসন্ধান ও মূল্যায়ন করা হবে।

মিলন রহমান/এফএ/জেআইএম