মাতৃত্বের কিছু সত্য এতটাই গভীর ও চমকপ্রদ যে তা প্রজন্ম পেরিয়ে ছড়িয়ে যায়, তবু অনেকেই টের পান না। এমনই এক সত্য হলো, আপনার মা যখন আপনার নানির গর্ভে ভ্রূণ হিসেবে বেড়ে উঠছিলেন, তখন সেখানেই আপনার অস্তিত্বের সূচনা হয়ে গিয়েছিল।
শুনতে প্রচণ্ড অদ্ভুত আর অবিশ্বাস্য মনে হলেও বিজ্ঞান এখন এটাই বলছে। চলুন একটু সহজ করে বুঝে নেওয়া যাক।
বিষয়টি কীভাবে সম্ভব?একজন নারী যখন কন্যাসন্তান গর্ভে ধারণ করেন, তখন সেই ভ্রূণের ডিম্বাশয় গঠন শুরু হয় গর্ভাবস্থার মধ্যভাগেই। এই সময়েই তৈরি হয়ে যায় ভবিষ্যতে ওই কন্যার জীবনে ব্যবহৃত হওয়ার মতো প্রায় সব ডিম্বাণুর প্রাথমিক রূপ। অর্থাৎ, আপনার মা যখন তার মায়ের গর্ভে ছিলেন, তখন তার শরীরে আপনার ভবিষ্যৎ কোষের উপস্থিতি ছিল।
বৈজ্ঞানিকভাবে এটি প্রতিষ্ঠিত - নারীরা জন্মের আগেই তাদের ডিম্বাণুর ভাণ্ডার নিয়ে পৃথিবীতে আসে। পরবর্তী জীবনে নতুন ডিম্বাণু তৈরি হয় না; বরং বিদ্যমান কোষগুলোর মধ্য থেকেই প্রতি মাসে একটি করে পরিপক্ব হয়।
এই প্রক্রিয়া বোঝায় - একটি গর্ভাবস্থায় একই সঙ্গে তিন প্রজন্ম জৈবিকভাবে সংযুক্ত থাকতে পারে - নানি (প্রথম প্রজন্ম); মা, যিনি তখন ভ্রূণ (দ্বিতীয় প্রজন্ম); এবং ভবিষ্যৎ নাতি বা নাতনি হিসেবে আপনার কোষের সূচনা (তৃতীয় প্রজন্ম)।
এটি কেবল কাব্যিক ধারণা নয়, এটি মানব প্রজনন ও জীববিজ্ঞানের বাস্তবতা।
স্বাস্থ্য ও পরিবেশের প্রভাবএখানে এসেই বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। গর্ভাবস্থায় একজন নারীর পুষ্টি, মানসিক চাপ, পরিবেশগত দূষণ ও হরমোনাল ভারসাম্য - এসব উপাদান ভ্রূণের বিকাশকে প্রভাবিত করে। গবেষণা বলছে, এই প্রভাব কেবল সন্তানের ওপরই সীমাবদ্ধ থাকে না; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জিন-এক্সপ্রেশন বা এপিজেনেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমেও প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
অর্থাৎ মাতৃত্ব শুধু একটি জীবন সৃষ্টি নয়, এটি একটি জৈবিক ধারাবাহিকতার অংশ।
না। এপিজেনেটিক প্রভাব মানে ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে যায়, এমন নয়। জীবনযাপন, পুষ্টি, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে অনেক ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বিজ্ঞান এখানে সম্ভাবনার কথা বলে, নিয়তির নয়।
মাতৃত্বকে নতুনভাবে দেখাএই তথ্য আমাদের মাতৃত্বকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শেখায়। একজন নারী তার শরীরে কেবল একটি সন্তানই বহন করেন না; তিনি বহন করেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনা। তিন প্রজন্মের এই অদৃশ্য সংযোগ আসলে এক ধরনের উত্তরাধিকার - যা রক্তের সম্পর্কের বাইরেও স্বাস্থ্য, যত্ন ও ভালোবাসার ধারাবাহিকতা বহন করে।
সূত্র: ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এএমপি/জেআইএম