রমজান মাসে সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতার শুধু ক্ষুধা নিবারণের মুহূর্ত নয়, এটি শরীরকে পুনরায় শক্তি জোগানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর হঠাৎ ভারী, ভাজাপোড়া বা অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার খেলে হজমের সমস্যা, অম্বল, গ্যাস্ট্রিক, এমনকি রক্তে শর্করার তারতম্য দেখা দিতে পারে। তাই ইফতারের খাবার নির্বাচন হওয়া উচিত সচেতন ও পুষ্টিকর। চলুন জেনে নেই ইফতারে কী ধরনের খাবার রাখা উচিত, কেন রাখা উচিত এবং কীভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ইফতার প্লেট তৈরি করা যায়।
ইফতার শুরু করার জন্য খেজুরের কথা আমরা সবাই জানি। ইসলামী ঐতিহ্যে এটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক যুক্তিও। খেজুরে প্রাকৃতিক চিনি (গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ) থাকে, যা দ্রুত শরীরে শক্তি জোগায়। সারাদিন না খেয়ে থাকার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা কিছুটা কমে যায়। ১–২টি খেজুর সেই ঘাটতি দ্রুত পূরণ করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এতে আছে আঁশ, পটাশিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।
খেজুরের সঙ্গে এক গ্লাস স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি পান করলে শরীর দ্রুত হাইড্রেটেড হয়। বরফ ঠান্ডা পানি এড়ানো ভালো, কারণ তা হঠাৎ পাকস্থলীতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ফলমূলইফতারে মৌসুমি ফল রাখা খুবই উপকারী। যেমন: তরমুজ, পেঁপে, আপেল, কলা, কমলা ইত্যাদি। ফলে থাকে প্রাকৃতিক চিনি, যা ধীরে ধীরে শক্তি জোগায়। প্রচুর পানি ও আঁশ থাকায় হজম ভালো হয়। ভিটামিন ও খনিজ শরীরের ঘাটতি পূরণ করে। ফলের চাট বা ফলের সালাদ ইফতারের জন্য ভালো বিকল্প হতে পারে। তবে অতিরিক্ত চিনি বা সিরাপ যোগ না করাই ভালো।
বাংলাদেশে ইফতারে ছোলা একটি জনপ্রিয় খাবার। সঠিকভাবে রান্না করলে এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর। ছোলায় রয়েছে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, আঁশ, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম। প্রোটিন শরীরের কোষ পুনর্গঠনে সাহায্য করে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সহায়তা করে। ছোলা, মুগডাল স্যুপ, সেদ্ধ ডিম বা অল্প তেলে তৈরি চিকেন কাবাব ইফতারের জন্য ভালো প্রোটিনের উৎস হতে পারে।
স্যুপসবজি বা মুরগির স্যুপ ইফতারে রাখলে তা হজমের জন্য উপকারী। দীর্ঘক্ষণ না খাওয়ার পর তরল ও হালকা খাবার পাকস্থলীর ওপর চাপ কমায়। সবজি স্যুপে গাজর, লাউ, শিম, ফুলকপি ইত্যাদি ব্যবহার করলে ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায়। এতে অতিরিক্ত লবণ বা ক্রিম ব্যবহার না করাই ভালো।
ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত মিষ্টি কেন কম খাওয়া উচিত?বাংলাদেশি ইফতারে পিয়াজু, বেগুনি, চপ, জিলাপি খুব জনপ্রিয়। তবে এগুলো অতিরিক্ত তেলে ভাজা ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খেলে হজমের সমস্যা হতে পারে, ওজন বেড়ে যেতে পারে, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল বাড়তে পারে। সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। সপ্তাহে এক-দুদিন অল্প পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে।
আরও পড়ুন: রোজার আগে ইফতারের সঠিক প্রস্তুতির টিপস রোজায় নতুন মায়েদের যত্ন নেবেন যেভাবে কার্বোহাইড্রেটের সঠিক নির্বাচনইফতারের পর অনেকেই সঙ্গে সঙ্গে ভারী ভাত বা পরোটা খেয়ে ফেলেন। এতে শরীরে হঠাৎ অতিরিক্ত ক্যালরি প্রবেশ করে। এর পরিবর্তে লাল আটা রুটি, ওটস, অল্প পরিমাণ ব্রাউন রাইস খাওয়া যেতে পারে। এগুলো ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘ সময় শক্তি দেয়।
রঙিন কৃত্রিম শরবতের বদলে ঘরে তৈরি লেবুর শরবত, তেঁতুলের শরবত বা ডাবের পানি বেছে নেওয়া ভালো। অতিরিক্ত চিনি শরীরে অপ্রয়োজনীয় ক্যালরি যোগ করে। ডাবের পানি প্রাকৃতিক ইলেক্ট্রোলাইটের ভালো উৎস, যা সারাদিনের পানিশূন্যতা দূর করতে সহায়ক।
একটি ভারসাম্যপূর্ণ ইফতার প্লেট কেমন হতে পারে?একটি আদর্শ ইফতার প্লেটে থাকতে পারে ১-২টি খেজুর, এক গ্লাস পানি বা ডাবের পানি, এক বাটি ফল, অল্প পরিমাণ ছোলা বা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার, একটি হালকা স্যুপ, সীমিত পরিমাণ ভাজাপোড়া। এভাবে খেলে শরীর ধীরে ধীরে শক্তি ফিরে পায় এবং হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে।
মনে রাখতে হবে, রমজানে ইফতার শুধু পেট ভরানোর বিষয় নয়; এটি শরীর ও মনের ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সচেতনভাবে পুষ্টিকর, হালকা ও প্রাকৃতিক খাবার বেছে নিলে রোজার ক্লান্তি দূর হয়, শক্তি ফিরে আসে এবং সুস্থ থাকা সহজ হয়। সারাদিনের সংযম যেন ইফতারের সময় অসচেতন খাদ্যাভ্যাসে নষ্ট না হয়, এই সচেতনতাই হতে পারে স্বাস্থ্যকর রমজানের চাবিকাঠি।
তথ্যসূত্র: ব্রিটিশ নিউট্রিশন ফাউন্ডেশন
জেএস/