রমজানে ডায়াবেটিস রোগীদের রোজা রাখা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দেয়। এসব প্রশ্নের সহজ ও ব্যবহারিক উত্তর নিয়ে একটি সচেতনতামূলক নোট প্রকাশ করেছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মারুফ রায়হান খান। তিনি বলেন, যথাযথ প্রস্তুতি ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে অধিকাংশ ডায়াবেটিস রোগীই নিরাপদে রোজা রাখতে পারেন।
রোজা রাখতে পারবেন কারা, কারা পারবেন নাডা. মারুফ রায়হান খান জানান, রোজা শুরুর আগে অবশ্যই চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রাক-রমাদান মূল্যায়ন করানো প্রয়োজন। রোগীর ডায়াবেটিসের নিয়ন্ত্রণ, পূর্বের জটিলতা, রক্তচাপ, রক্তে চর্বির মাত্রা, অন্যান্য রোগ বিবেচনায় চিকিৎসক সিদ্ধান্ত দেন তিনি রোজা রাখতে পারবেন কি না।
যাদের ডায়াবেটিস একেবারেই নিয়ন্ত্রণে নেই, বারবার হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়, সম্প্রতি ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস হয়েছে, অঙ্গ বিকলতা (হার্ট, কিডনি বা লিভার), গুরুতর রেটিনোপ্যাথি, স্নায়ু বা বড় রক্তনালির জটিলতা, সাম্প্রতিক হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক, তীব্র সংক্রমণ, ক্যানসারের জটিল অবস্থা, অনিয়ন্ত্রিত মৃগীরোগ, মারাত্মক মানসিক সমস্যা, গর্ভাবস্থা বা দুগ্ধদানকাল—এমন রোগীদের রোজা না রাখাই শ্রেয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রোজার সম্ভাব্য উপকারিতাডা. মারুফ বলেন, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য রোজার কিছু উপকারও রয়েছে। যেমন—বিপাকীয় কার্যক্রমের উন্নতি।অতিরিক্ত ওজন হ্রাস।উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা।রোগ প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী হওয়া।নিয়মানুবর্তিতার চর্চা, যা ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ।
ঝুঁকি ও সতর্কতারোজায় ডায়াবেটিস রোগীদের প্রধান ঝুঁকি হলো রক্তে গ্লুকোজ কমে যাওয়া (হাইপোগ্লাইসেমিয়া), বেড়ে যাওয়া (হাইপারগ্লাইসেমিয়া), পানিশূন্যতা ও ওজনের তারতম্য।
তিনি সতর্ক করে বলেন, হাইপোগ্লাইসেমিয়া মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে এবং রোগী কোমায়ও চলে যেতে পারেন।
অতিরিক্ত ঘাম, হাত-পা কাঁপা, বুক ধড়ফড়, অতিরিক্ত ক্ষুধা, ঝিমুনি, কথা জড়িয়ে যাওয়া, মাথাঘোরা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে রোজা ভেঙে চিনি মিশ্রিত পানি বা শর্করাযুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে—ইফতারের অল্প সময় আগে হলেও।
কখন অবশ্যই রোজা ভাঙতে হবেরক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ৩.৯ মিলিমোল/লিটারের নিচে নেমে গেলে বা ১৬.৬ মিলিমোল/লিটারের বেশি হলে অবিলম্বে রোজা ভেঙে ফেলতে হবে বলে জানান ডা. মারুফ রায়হান খান। রোজা রেখে রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা করাতে শরিয়াহগত কোনো বাধা নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনরমজানে আগের মতোই স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি। সেহরিতে ধীরে হজম হয় এমন শর্করা, ভাত-রুটি, ডাল, সবজি, মাছ-মাংস, ডিম, দুধ ও ফল খাওয়ার কথা বলেন। ইফতারে অতিরিক্ত মিষ্টি ও চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার এবং পর্যাপ্ত পানি পান করার ওপর জোর দেন তিনি।
সেহরি দেরিতে এবং ইফতার তাড়াতাড়ি করার ধর্মীয় নির্দেশনাও হাইপোগ্লাইসেমিয়া প্রতিরোধে কার্যকর বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ওষুধ ও ইনসুলিন ব্যবস্থাপনাডা. মারুফ বলেন, ওষুধ ও ইনসুলিনের ডোজ অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে। সাধারণভাবে কিছু ওষুধের সময়সূচি ইফতার ও সেহরির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবর্তন করা হয়। দুবেলা ইনসুলিন গ্রহণকারীরা সকালের ডোজ ইফতারের আগে এবং রাতের ডোজের অর্ধেক সেহরিতে নিতে পারেন—তবে এটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
রোগীদের প্রতি বার্তাডা. মারুফ রায়হান বলেন, শারীরিকভাবে সক্ষম হলে ডায়াবেটিস রোগীরাও নিরাপদে রোজা রাখতে পারেন। তবে গুরুতর অসুস্থতার কারণে চিকিৎসকের পরামর্শে রোজা রাখতে না পারলে মন খারাপের কারণ নেই। পরবর্তীতে কাজা আদায়ের সুযোগ রয়েছে।
রমাদানকে সুস্থতা, সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবে গ্রহণ করে সচেতনভাবে রোজা পালনের আহ্বান জানান এই চিকিৎসক।
এসইউজে/এমআইএইচএস/