জাতীয়

বছর বছর হয় দোয়া মাহফিল, ৭১ মৃত্যুর বিচার মেলেনি ৭ বছরেও 

২০ ফেব্রুয়ারি, সাত বছর আগের এই দিনে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নিয়েছিল ৭১টি তাজা প্রাণ। বিভীষিকাময় সেই রাতটি আজও তাড়িয়ে বেড়ায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে। তাদের চোখেমুখে স্বজন হারানোর বেদনার সঙ্গে যোগ হয়েছে বিচার পাওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষা। বছর বছর দোয়া মাহফিল ও আত্মার শান্তি কামনার মধ্য দিয়ে দিনটি অতিবাহিত হলেও বিচারকাজ শেষ হয়নি সাত বছরেও। 

২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে চকবাজার থানার চুড়িহাট্টা মোড়ে ওয়াহেদ ম্যানশন নামের একটি চারতলা ভবন থেকে ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত হয়। গায়ে গায়ে লাগানো ভবনগুলোতে থাকা রাসায়নিক দ্রব্য, প্লাস্টিক ও পারফিউমের দোকান এবং গুদামের কারণে মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। ওই রাতে চুড়িহাট্টা এলাকায় ছিল তীব্র যানজট। রিকশা, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও পথচারীতে ঠাসা সড়কে হঠাৎ বিকট শব্দে আগুন ছড়িয়ে পড়লে দিগভ্রান্ত হয়ে পড়ে মানুষ। অনেকেই বুঝে ওঠার আগেই আগুনে পুড়ে প্রাণ হারান। 

ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট প্রায় ১৪ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও ততক্ষণে শ্মশানে পরিণত হয় পুরো এলাকা। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় ৬৭ জনের পোড়া মরদেহ, পরে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১ জনে। দোকানপাট, রিকশা-গাড়ি সম্পূর্ণ পুড়ে দুমড়েমুচড়ে যায়।

প্রথমদিকে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা বলা হলেও তদন্তে উঠে আসে, আগুনের উৎপত্তি হয়েছিল ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলা থেকে। সেখানে দোকানের পাশাপাশি ছিল বিপুল পরিমাণ দাহ্য রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও প্রসাধন সামগ্রীর গুদাম। এসব ঝুঁকিপূর্ণ সামগ্রীই আগুনকে দ্রুত দাবানলে রূপ দেয়। কিন্তু এত বড় ট্র্যাজেডির সাত বছর পরও আইনি প্রক্রিয়া কার্যত অচল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামলাটি এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়েই আটকে আছে। এ ঘটনায় হওয়া মামলায় ১২৬ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৭ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। আসামিরা সবাই জামিনে মুক্ত থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ওই ঘটনার পর পুলিশ চার ধরনের ৪৯টি আলামত সংগ্রহ করে। আলামতের মধ্যে ২৬টি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনীর টিউব, বোতল ও ক্যান। এসব আলামত পরীক্ষার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছিল। তাতে সুগন্ধিগুলো থেকে আট রকমের উচ্চমাত্রার দাহ্য বস্তুর উপস্থিতি পাওয়া যায়।

সেই অভিযোগপত্রে আগুনের বিস্তারের কারণ হিসেবে অতি দাহ্য ওই রাসায়নিককে দায়ী করা হয়েছে, যা পাওয়া যায় ১০ রকমের (ব্র্যান্ডের) সুগন্ধির ক্যানিস্টার ও বোতল থেকে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, আগুন লাগার পর ওয়াহিদ ম্যানশনে সশব্দে ক্যানগুলো বিস্ফোরিত হচ্ছিল। বিস্ফোরিত জ্বলন্ত ক্যান উড়ে এসে রাস্তাতেও পড়ছিল।

নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের সময় দেশের বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক থেকে স্বজনহারা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হলেও তারা এক টাকাও পাননি। প্রতি বছর চুড়িহাট্টার চৌরাস্তায় নিহতদের জন্য দোয়া মাহফিল ও তাদের আত্মার শান্তি কামনার মধ্য দিয়েই দিনটিকে স্মরণ করেন তারা। 

টিটি/এমকেআর