শহর শুরু হয় মানুষের চোখ, পায়ের ছন্দ, শব্দ আর শ্বাস থেকে। এটি কেবল রাস্তাঘাট বা ভবনের সমষ্টি নয়; এটি হলো মানুষের জীবনধারা, মিলনস্থল, প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা। এই অনুভূতি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে বহু বছর আগের স্টকহোমের (গামলা স্থান) পুরনো শহরে।
সরু রাস্তাগুলোতে নিচতলায় দোকান, ওপরে বাসা। শিশুরা খেলত রাস্তার কোণে, বৃদ্ধরা হঠাৎ দেখা হতো একে অপরের সঙ্গে, ব্যবসায়ীরা কথা বলত খোলা বাগানে। কেউ পরিকল্পনা করত না কাকে দেখা হবে; শহরের প্রতিটি স্থানেই জীবন বয়ে যেত। প্রতিটি চত্বর, প্রতিটি দোকান, প্রতিটি ফুটপাথ ছিল মানুষের জন্য।
পুরনো ঢাকা-ও একইভাবে মানুষের জন্য তৈরি। হাটবাজার, চৌরাস্তা, সরু গলি সবই জীবনের ছন্দ তৈরি করত। ব্যবসায়ী, শিশু, বৃদ্ধ সকলেই শহরের ছন্দে মিলিত হতো। সেখানে শহর মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল; মানুষ শহরের জন্য নয়।
কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া ধীরে ধীরে এই ছন্দ ভেঙে দিয়েছে। গাড়ির আবির্ভাব শহরের কেন্দ্র দখল করতে শুরু করলো। রাস্তা প্রশস্ত হলো, চত্বর রূপ নিলো পার হওয়া স্থান হিসেবে। মানুষ ধীরে ধীরে সরতে লাগলো। শহর এখন গাড়ির জন্য, মানুষের জন্য নয়। আধুনিক যানজট, লোহার খাঁচার মত পার্কিং, ধুলোবালু আর চিৎকার সবকিছু একত্রিত হয়ে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। শহর যেন ইটের পাজরে বন্দি জীবন, যেখানে মানুষের স্বাধীনতা সীমিত, শান্তি নেই।
বাণিজ্য ও সামাজিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে শহরের বাইরে চলে গেছে। বড় শপিংমল, আউটলেট, বাণিজ্যিক এলাকা সুবিধাজনক, কার্যকর, কিন্তু এখানে নেই মানুষের অপ্রত্যাশিত মিলন, ধীরে বসা বা হঠাৎ দেখা হওয়ার আনন্দ।
আজকের স্টকহোম সিটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল, নিরাপদ। কিন্তু সামাজিকভাবে এটি খণ্ডিত। পর্যটক আসে, ছবি তোলে, কেনাকাটা করে, চলে যায়। বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন শহরের বাইরে সংগঠিত। ফিকা এখনো আছে কফি, কথাবার্তা, সম্পর্ক। কিন্তু আগের মতো spontaneity নেই। শহরের কেন্দ্র আর নিজে নিজে সামাজিকতা তৈরি করে না।
যখন আমরা বিশ্ব শহরগুলো ভ্রমণ করি যেমন দুবাই, টোকিও, হংকং, সিঙ্গাপুর আমরা দেখি শহর এক ধরনের প্রচণ্ড গতিশীল জীবন্ত সংগীত। রাস্তা, ফুটপাত, মল, স্কাইব্রিজ সব একসাথে ভরপুর। মানুষ হাঁটছে, গাড়ি চলছে, দোকান উন্মুক্ত, বিজ্ঞাপন ঝলমল করছে, পর্যটক ঘুরছে, স্থানীয়রা কাজ করছে। এটি শান্ত বা পরিকল্পিত নয়; উপস্থিতি মানে সবকিছুর মধ্যে টিকে থাকা, প্রতিটি মুহূর্ত অনুভব করা। শহরের ছন্দ দ্রুত, কখনও বিশৃঙ্খল, কিন্তু তা বাস্তব।
অন্যদিকে ইউরোপের ক্লাসিক শহর যেমন স্টকহোম, প্যারিস, লন্ডন আমরা যাত্রা করি অন্য অভিজ্ঞতার জন্য। রাস্তা পরিচ্ছন্ন, স্থাপত্য মনোরম, চত্বর ও বাগান সুসংগঠিত। পর্যটক ও স্থানীয়রা ধীরে হাঁটে, প্রায়শই ফোকাস থাকে স্থাপত্য বা দৃশ্য দেখার ওপর। শহর সুন্দর, নিরাপদ, শৃঙ্খল কিন্তু সামাজিক উপস্থিতি প্রায়ই পরিকল্পিত বা পর্যটককেন্দ্রিক। জীবন বোঝা যায়, তবে spontaneity কম।
এই তুলনা দেখায় বড় শহরের গতি, বিশৃঙ্খলতা ও ভিড় মানুষের প্রাকৃতিক উপস্থিতি ও জীবনের ছন্দ তৈরি করতে পারে, যদিও সবসময় আরামদায়ক নয়। ইউরোপের শহর সৌন্দর্য ও স্থাপত্যে প্রশান্তি দেয়, কিন্তু শহরের সামাজিক প্রাণ কম। পাঠকের চোখে বোঝা যায় যে শহরের কেন্দ্র কেবল রাস্তাঘাট নয়; এটি মানুষের উপস্থিতি, মিলন এবং জীবনের ছন্দ।
ভেনিস ব্যতিক্রম। এখানে রাস্তা মানুষের জন্য, গাড়ির জন্য নয়। হাঁটা মানে পৌঁছানো নয়—হাঁটা মানে থাকা, ভাবা, অনুভব করা। শহরের ছন্দ মানুষের জন্য তৈরি, কেন্দ্র এখনও জীবন ধারণ করে, শুধু চলাচল নয়।
বাংলাদেশের বড় শহর যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম অত্যন্ত ভিন্ন। জনসংখ্যা বেশি, কিন্তু নিরাপদ ও স্বাধীন চলাচল সীমিত। ট্রাফিক, দূষণ, অনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি নগরজীবনকে সংকুচিত করে। পার্ক, চত্বর, বিনামূল্যের সামাজিক মিলনস্থল কম। মানুষ একত্র হয় মূলত কেনার কারণে; ক্রয়ক্ষমতা না থাকলে সামাজিক উপস্থিতি থাকে না। শহর জীবন নয়, বেঁচে থাকার যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
সব অভিজ্ঞতা মিলে একটি জটিল প্রশ্ন তৈরি করে: শহর যদি মানুষকে নিরাপদে হাঁটার, বসার, দেখা করার সুযোগ না দেয়, তবে শহরের সামাজিক ভূমিকা কোথায়? শহরের কেন্দ্র মানুষের জন্য না হলে, শহর তার মূল অর্থ হারায়।
জীবনকে আবার কেন্দ্র করতে হবে। এটি নস্টালজিয়া নয়, রোমান্টিক কল্পনা নয়; এটি বাস্তব সামাজিক প্রয়োজন। শহর এমন হতে হবে যেখানে মানুষ থাকতে চায়, শুধু যেতে নয়। যেখানে চলাচল মানে শুধু পৌঁছানো নয়, বরং উপস্থিত থাকা।
স্টকহোমের ইতিহাস, ভেনিসের ব্যতিক্রম, বাংলাদেশের কঠিন বাস্তবতা, বিশ্ব শহরের তুলনা সবই একই বার্তা দেয়। শহর মানুষের কেন্দ্র না হলে, শহর খালি হয়। কেন্দ্র জীবনের জন্য না হলে, আমরা শুধু স্থান পাই, জীবন পাই না।
এটি লেখা শেষ নয়। এটি শুরু একটি প্রশ্ন, একটি আহ্বান: আমরা কীভাবে একসাথে থাকতে চাই, যাতে মানুষ প্রকৃতভাবে শহরের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে? হাঁটলে মানুষ পাওয়া যায়, দেখা হয়, থামা যায়। মানুষ থাকলে শহর বাঁচে। মানুষ না থাকলে, শহর শুধু কংক্রিট আর রাস্তাই থাকে, মানুষের মাঝে বেঁচে থাকা যায় না।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনrahman.mridha@gmail.com
এমআরএম/জেআইএম