আন্তর্জাতিক

ভারতে শীর্ষ গরুর মাংস রপ্তানিকারকের সর্বোচ্চ অনুদান পায় মোদীর বিজেপি

ভারতের অন্যতম শীর্ষ গরুর মাংস রপ্তানিকারক আল্লানা গ্রুপ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) রেকর্ড ৩০ কোটি রুপি অনুদান দিয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া আর্থিক বিবরণীতে উঠে এসেছে এ তথ্য।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালে ভারতের গরুর মাংস রপ্তানি চার বিলিয়ন (৪০০ কোটি) ডলার অতিক্রম করেছে, যা ২০১৮ সালের পর প্রথমবারের মতো এ সীমা ছাড়ালো। ভারতীয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে আল্লানা গ্রুপের প্রধান রপ্তানি প্রতিষ্ঠান অ্যালানাসনস প্রাইভেট লিমিটেডের আয় ২০১৮ সালের পর প্রথমবারের মতো ১০ হাজার কোটি রুপি ছাড়িয়েছে।

শাসক দলের পক্ষ থেকে গরুর মাংস নিয়ে কড়া অবস্থান থাকা সত্ত্বেও কেন এ খাতের একটি প্রতিষ্ঠান বিজেপিকে বিপুল অর্থ সহায়তা দিচ্ছে—এ প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক মহলে।

আরও পড়ুন>>মোদীর আমলেই ফুলেফেঁপে উঠেছে ভারতের গরুর মাংস রপ্তানিভারতে গরুর মাংস বহনের সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা, গ্রেফতার ৩ভারতে ‘গোরক্ষকদের’ হামলায় নিহত আরও এক মুসলিম যুবকভারতে ফ্রিজে গরুর মাংস পাওয়ায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ১১ জনের বাড়ি

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম স্ক্রলকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় আল্লানা গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক ফওজান আলাভি বলেন, মোদী সরকারের আমলে ‘টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক রূপান্তর’ ঘটছে এবং ‘বিকশিত ভারত’ গঠনের লক্ষ্যে গ্রুপটি ইতিবাচক অবদান রাখতে চায়।

মোদী ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্কে টানাপড়েন

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর মাংসশিল্পের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের ধরন বদলে যায়। উত্তর প্রদেশসহ কয়েকটি রাজ্যে, যেখানে আল্লানা গ্রুপের বড় প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট রয়েছে, হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর হামলার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। বিশেষ করে গরুর মাংস পরিবহনের অভিযোগে মুসলিম ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটে।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে আয়কর বিভাগ আল্লানা গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট শতাধিক স্থাপনায় অভিযান চালায়। ওই বছরের এপ্রিলে আয়কর বিভাগ দাবি করে, সংস্থাটি প্রায় দুই হাজার কোটি রুপির কর ফাঁকি দিয়েছে। যদিও এ অভিযোগের জবাব প্রকাশ্যে দেয়নি আল্লানা গ্রুপ।

এর পরপরই প্রতিষ্ঠানটি ইলেক্টোরাল বন্ড কেনা শুরু করে। প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে তারা সাত কোটি রুপির বন্ড কেনে, যার মধ্যে পাঁচ কোটি রুপি দেয় শিবসেনাকে এবং দুই কোটি রুপি বিজেপিকে। সে সময় মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ও বিজেপি যৌথভাবে ক্ষমতায় ছিল।

অনুদানের ধারা অব্যাহত

মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার আগেই আল্লানা গ্রুপ বিজেপিকে সরাসরি অনুদান দিয়েছিল। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দুই কোটি রুপি এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫০ লাখ রুপি অনুদান দেয় তারা।

এরপর ২০১৯ সালে দুই কোটি রুপির ইলেক্টোরাল বন্ড দেয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফ্রিজেরিও কনজারভা আল্লানা প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে আরও দুই কোটি রুপি অনুদান দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন>>ভারতে গরুকে জাতীয় পশু ঘোষণার দাবিভারতে গোবর মূত্রের সাবান শ্যাম্পু টুথপেস্ট বিক্রি করে কোটিপতিভারতে বিয়ের অনুষ্ঠানে ‘গরুর মাংস’ সন্দেহে সংঘর্ষ, নমুনা গেলো ফরেনসিকে

কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনুদানের পরিমাণ ১৫ গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ কোটি রুপিতে। এই অর্থ দেওয়া হয় চারটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে—অ্যালানাসনস প্রাইভেট লিমিটেড, ফ্রিজেরিও কনজারভা আল্লানা প্রাইভেট লিমিটেড, ফ্রিগোরিফিকো আল্লানা প্রাইভেট লিমিটেড এবং ইন্দাগ্রো ফুডস প্রাইভেট লিমিটেড।

নতুন বাজার ও রপ্তানি বৃদ্ধি

২০১৯ সালে চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সীমান্তে ‘গ্রে ট্রেড’ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ শুরু করলে ভারতের গরুর মাংস রপ্তানি বড় ধাক্কা খায়। ভিয়েতনাম হয়ে চীনে যে মাংস রপ্তানি হতো, তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

এরপর নতুন বাজার খুঁজতে শুরু করে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা, বিশেষ করে ইসলামী দেশগুলোতে। মিশর ও মালয়েশিয়ায় ভারতীয় গরুর মাংসের চাহিদা বাড়ে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ দুই দেশে রপ্তানি দ্বিগুণ হয়ে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন (১২০ কোটি) ডলারে পৌঁছায়।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ভারত সরকার ইন্দোনেশিয়াকে আরও বেশি মহিষের মাংস কেনার আহ্বান জানায়। একই মাসে সরকার হালাল সনদসংক্রান্ত নতুন নির্দেশিকা প্রণয়ন করে, যা ২০২৪ সালের অক্টোবরে কার্যকর হয়। পশ্চিম এশিয়া, তুরস্ক ও সিঙ্গাপুরের বাজার লক্ষ্য করে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে মিশর ছিল ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম গরুর মাংস রপ্তানি বাজার। ওই সময় অ্যালানাসনস প্রাইভেট লিমিটেডের আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৩২০ কোটি রুপিতে, যা ২০২১ সালের পর থেকে ধারাবাহিক বৃদ্ধির ফল।

আলাভি বলেন, আয়কর কাঠামো যৌক্তিক করা এবং জিএসটি প্রক্রিয়া সরলীকরণ প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের বাণিজ্য কূটনীতি এবং একাধিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যক্রম আল্লানা গ্রুপের প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।

সূত্র: স্ক্রলকেএএ/