আন্তর্জাতিক

ভারতে ৩ প্রবীণ মুসলিমকে মারধরের ভিডিও নিয়ে তোলপাড়

‘আমাকে আর আমার সঙ্গীদের মারা হয়েছে, ধর্ম তুলে কটু কথা বলা হয়েছে। আমরা শান্তভাবে বসে ছিলাম। কিন্তু ওরা আমাদের ভিডিও তুলে নিজেরাই ভাইরাল করে দিয়েছে। আমরা কোনো ঝগড়া বিবাদ চাই না, কিন্তু আমাদের ন্যায় বিচার চাই। অভিযুক্তের তো জামিন হয়ে গেছে, প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেসব ধারা দেওয়ার দরকার ছিল, তা দেওয়া হয়নি।’ কথাগুলো বলছিলেন উত্তর প্রদেশের বদায়ূঁর সহসওয়ান থানা এলাকার বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী আব্দুল সালাম।

সালাম ও তার সঙ্গীদের মারধর করার একটি ভিডিও সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তাতে দেখা যায়, এক যুবক তিনজন প্রবীণ মুসলিমকে ক্রমাগত থাপ্পড় মারছেন।

অভিযোগ পেয়ে পুলিশ অক্ষয় শর্মা ওরফে ছোট্টু নামে ওই যুবককে গ্রেফতার করেছিল। তবে তিনি জামিন পেয়ে এখন জেলের বাইরেই রয়েছেন।

কী হয়েছিল সেদিন?

আব্দুল সালাম ওই ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে আছেন। তার মোবাইল ফোনাও বন্ধ রয়েছে। তার অন্য দুই সঙ্গী আরিফ ও জাভেদ সংবাদমাধ্যম থেকে দূরেই রয়েছেন। সালাম অবশ্য বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন।

আরও পড়ুন>>ভারতে হিন্দুত্ববাদী মবের প্রতিবাদ করায় উল্টো যুবকের বিরুদ্ধেই মামলামুসলিমদের ছবিতে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর ‘গুলি ’, বিতর্কের ঝড়ভারতে মুসলিম হওয়ায় ত্রাণের কম্বল পেলেন না নারী, ভিডিও ভাইরাল

‘ঘটনা গত ১৬ ফেব্রুয়ারির। আমার দুই সঙ্গী আরিফ আর জাভেদকে নিয়ে রুদায়ন এলাকার ইসলামনগর থানা অঞ্চলে গিয়েছিলাম সাহায্য তুলতে। এক যুবক পেছন থেকে এসে আমাদের আধার কার্ড দেখতে চাইলো। এরপরেই সে আমাদের ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করে, মারধর করে। মাথার টুপিও খুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। বলছিল যে আমরা চোর,’ বলেন আব্দুল সালাম।

This is not a normal video, this is:State of Muslims in this countryState of law & order under BJPState of Ram Rajya in UPState of justice in today’s IndiaState of democracy under an authoritarian mindsetState of human rights in broad daylight.https://t.co/vVAZmvj6F0

— Dr Nimo Yadav 2.0 (@DrNimoYadav) February 21, 2026

তার অভিযোগের ভিত্তিতে ১৯ ফেব্রুয়ারি পুলিশ এফআইআর দায়ের করে। এরপর ইসলামনগর এলাকারই বাসিন্দা অক্ষয়কে গ্রেফতার করে হেফাজতে পাঠায় পুলিশ।

অভিযোগপত্রে লেখা হয়, আব্দুল সালাম আর তার দুই সঙ্গী রুদায়ন এলাকার মূল সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন। পেছন থেকে এক ব্যক্তি হর্ন বাজায়। কিন্তু তারা সেটা শুনতে পাননি। এ নিয়েই অশান্তি লাগে, মারধর করা হয়।

স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা সুনীল কুমার বিবিসিকে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট ঘটনায় পুলিশ রিপোর্ট দায়ের করে অভিযুক্তকে হেফাজতে পাঠিয়েছিল। তদন্ত চলছে।

তবে পুলিশের কর্মকাণ্ডে অখুশি আব্দুল সালাম। তিনি জানান, ‘আমাদের ধর্ম তুলে কটু কথা বলা হয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ করার চেষ্টা হয়েছিল। তবুও যেসব ধারায় অভিযোগ দায়ের করা উচিত ছিল, পুলিশ তা করেনি। সেজন্য তো দ্রুত জামিন পেয়ে গেলো। আমরা ঝগড়া বিবাদ চাই না, তবে ন্যায়বিচার তো পাওয়া উচিত।’

আব্দুল সালামের প্রতিবেশী শাকির আনসারি বলেন, ‘আব্দুল সালাম খেটে খাওয়া মানুষ। তিনি রুদায়ন এলাকায় চাঁদা তুলতে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে অন্য যে দুজন ছিলেন আরিফ আর জাভেদ, তারাও খেটে খাওয়া মানুষ। তাদের ন্যায়বিচার পাওয়া উচিত।’

কে অভিযুক্ত অক্ষয় শর্মা?

ওই ঘটনায় অভিযুক্ত অক্ষয় শর্মা বা তার পরিবারের সঙ্গে চেষ্টা করেও কথা বলা যায়নি। তার ভাষ্যটা জানার জন্য শর্মার মোবাইলেও ফোন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে তার মোবাইল বন্ধ ছিল।

পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগে আব্দুল সালাম জানিয়েছেন, অভিযুক্ত নিজেকে বজরং দলের নেতা বলে এবং আধার কার্ড দেখতে চায়।

আরও পড়ুন>>ভারতে বাংলাদেশি সন্দেহে আরও এক মুসলিম শ্রমিককে হত্যাভারতে ‘গোরক্ষকদের’ হামলায় মুসলিম যুবক নিহত ভারতে সুফি মাজার গুঁড়িয়ে দিলো হিন্দুত্ববাদীরা, গ্রেফতার শূন্য

এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে বিবিসি যোগাযোগ করেছিল স্থানীয় বজরং দল নেতৃত্বের সঙ্গে। তবে অনেক চেষ্টা করেও তাদের সঙ্গে কথা বলা যায়নি।

তবে বদায়ুঁর সহসওয়ান এলাকা থেকে সমাজবাদী পার্টির বিধায়ক ব্রজেশ ইয়াদভ অক্ষয় শর্মার ব্যাপারে কিছু তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অক্ষয় শর্মা গো-রক্ষা মিশন সংগঠনের জেলা সভাপতি। তার একটা নিয়োগপত্র আমার কাছেই আছে। এই ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আমি সিনিয়র পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলেছি।’

বিবিসি অবশ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে পারেনি অক্ষয় শর্মা সত্যিই ‘গো-রক্ষা মিশন’-এর সঙ্গে যুক্ত কি না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক স্থানীয় সাংবাদিক বলেন, ‘অক্ষয়ের বয়স প্রায় ২১ বছর। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। চাষাবাদের কাজ করে।’

এর আগে এ ধরনের মারধরের কোনো ঘটনার সঙ্গে অক্ষয় শর্মা জড়িত ছিলেন না বলেই জানান ওই সাংবাদিক।

মোদী জমানায় মুসলিমদের ওপর হামলা বেড়েছে

নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি ক্ষমতায় আসে ২০১৪ সালে। তারপর থেকেই ভারতে মুসলিমদের নিগ্রহের ঘটনা বেড়ে চলেছে।

শুরুটা হয়েছিল বাড়িতে গোমাংস রাখা বা গণপরিবহনে গোমাংস বহন করার অভিযোগ তুলে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলার একাধিক ঘটনা দিয়ে। এরপরে শুরু হয় গরু ব্যবসায়ীদের মারধর ও গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলার একের পর এক ঘটনা।

বাজার থেকে বৈধ পথে চাষের জন্য বা পালন করার জন্য গরু নিয়ে যাওয়ার সময়েও অনেক মুসলিমকে গণপিটুনির শিকার হতে হয়েছে তথাকথিত ‘গো-রক্ষকদের’ হাতে।

আবার নানা মসজিদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয়েছে এই অভিযোগে, সেগুলো নাকি হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে গড়ে তোলা হয়েছিল ভারতে মুসলিম শাসনামলে।

কখনো ‘লাভ-জিহাদ’ বা ‘ফ্লাড জিহাদ’-এর মতো শব্দ চয়ন করে মুসলিমবিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে। এতে উসকানি দিয়েছে ডানপন্থি মূলধারার কিছু গণমাধ্যমও।

বছর দুয়েক আগে বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, ভারতে যেসব এলাকায় মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বেড়েছে, তার তিন-চতুর্থাংশ বিজেপিশাসিত অঞ্চলগুলোতে ঘটেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

ওই প্রতিবেদনেই ‘বিয়িং মুসলিম ইন হিন্দু ইন্ডিয়া’ বইয়ের লেখক জিয়া উস সালামকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছিল, ‘ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠী যেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে পড়েছেন, তারা নিজের দেশেই অদৃশ্য সংখ্যালঘু।’

তবে বিজেপি এবং নরেন্দ্র মোদী ভারতে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের বিষয়টি অস্বীকার করে থাকেন।

সূত্র: বিবিসি বাংলাকেএএ/