ইতিহাসের সাক্ষী সাজিদ রাজার মসজিদ
প্রায় ৮ একর জায়গাজুড়ে শান্ত পুকুর। ভোরের আলো কিংবা বিকেলের সোনালি রোদে স্বচ্ছ পানিতে ভেসে ওঠে পিলার ও গম্বুজে সাজানো প্রাচীন মসজিদের অপার্থিব প্রতিচ্ছবি। সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার আটগ্রাম এলাকায় সাজিদ রাজার বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ যেন একটি স্থাপনা নয়—ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা ও ধর্মীয় আবেগের জীবন্ত স্মারক।
সপ্তদশ শতকের শুরুতে জমিদার সাজিদ রাজার প্রভাব ছিল পুরো এলাকায়। প্রায় ১৫ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা তাঁর রাজবাড়ি আজও অতীতের গল্প বলে যায়। রাজবাড়ির ভেতরে আছে তেরোচালার একটি অনন্য টিনের ঘর, যা ব্রিটিশ আমলে কলকাতার মিস্ত্রিদের হাতে নির্মিত হয়েছিল। ইতিহাসের নানা স্তর পেরিয়ে স্থাপনাগুলো আজও বহন করছে বিস্মৃত সময়ের ছাপ।
১৭৪০ খ্রিষ্টাব্দে সাজিদ রাজা নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে তাঁর বাড়ির সামনে নির্মাণ করেন পিলার ও গম্বুজ শোভিত দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই মসজিদ শুধু ইবাদতের স্থানই নয় বরং গ্রামের মানুষের হৃদয়ের কেন্দ্র হয়ে আছে। আজও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে গ্রামের মানুষ এখানে একত্রিত হন।
পুরোনো দেওয়াল, খোলা পরিবেশ আর প্রকৃতির স্নিগ্ধ ছোঁয়া মিলিয়ে মসজিদটির ভেতরে আছে অনন্য প্রশান্তি। চারপাশের মুক্ত বাতাসে এমন স্বস্তি যে, গরমের দিনেও এখানে বৈদ্যুতিক পাখার প্রয়োজন হয় না—প্রকৃতির নিজস্ব শীতলতা যেন ইবাদতে নিমগ্ন মানুষকে আলাদা প্রশান্তি দেয়।

মসজিদের সামনে সাজিদ রাজা খনন করেছিলেন প্রায় ৮ একর আয়তনের বিশাল পুকুর। একসময় প্রজারা এই পুকুরের পানি পান করে তৃষ্ণা মেটাতেন; আজও আশপাশের মানুষ সেই পানি ব্যবহার করছেন। পুকুরের শান্ত জলে মসজিদের প্রতিচ্ছবি যেন সময়ের গভীর থেকে উঠে আসা এক নীরব দোয়া।
সাজিদ রাজার বংশধর এবং সিলেটের মতিন উদ্দিন আহমদ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তাফা শাহ জামান জানান, আঠারো শতকের শুরুতে জমিদার সাজিদ রাজা এ অঞ্চল শাসন করতেন। তিনি মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। তিন শতাধিক বছরের পুরোনো এ স্থাপনা শুধু ইতিহাস নয়—এ অঞ্চলের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
- আরও পড়ুন
শতবর্ষী ঐতিহ্যের স্মারক যে মসজিদ
প্রাচীন দেওয়াল, গম্বুজের নিচে ধ্বনিত আজানের সুর আর খোলা বাতাসে ইবাদতের প্রশান্তি—সব মিলিয়ে সাজিদ রাজার এই মসজিদ যেন সময়ের সীমানা পেরিয়ে আজও মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, ইতিহাসের মাঝে লুকিয়ে থাকে আধ্যাত্মিকতার চিরন্তন আলো।
জেএএইচ/এসইউ