দেশজুড়ে

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের অর্ধকোটি টাকা ও ১১২ টন চালের হদিস নেই

রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়িত গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার প্রকল্পে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার তথ্য উঠে এসেছে। মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা (অডিট) প্রতিবেদনে মোট ১৮টি আপত্তিতে ৫৩ লাখ ১৪ হাজার ৯৭৯ টাকা এবং ১১১ দশমিক ৭২৯ মেট্রিক টন চালের হিসাবে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে।

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সিনিয়র ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসার নাসির খানের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই অনিয়মের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ব্রডশিট জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বাক্ষরবিহীন ভাউচারে টাকা উত্তোলন

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, পবা উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) প্রকল্পের ১ লাখ ১৬ হাজার টাকার ভাউচারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কোনো স্বাক্ষর ছাড়াই অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে চারঘাট উপজেলায়, যেখানে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার ভাউচারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ছিল না। গোদাগাড়ী উপজেলায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার ভাউচারে ক্রেতা ও কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ছাড়াই অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা পুঠিয়া উপজেলায়, সেখানে ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৪১৪ টাকার ভাউচারে ব্যয়ের বিবরণী পর্যন্ত লেখা হয়নি এবং কোনো কর্মকর্তার স্বাক্ষরও ছিল না।

তালিকা ও স্বাক্ষর ছাড়াই চাল বিতরণ

অডিট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তানোর, বাগমারা, দুর্গাপুর ও বাঘা উপজেলায় কয়েক লাখ টাকার প্রকল্পে কোনো মাস্টাররোল (শ্রমিকদের তালিকা ও স্বাক্ষর) ছাড়াই খরচ দেখানো হয়েছে। তানোর উপজেলায় ৬ লাখ টাকার শুকনা খাবার ক্রয়ের কোনো ভাউচার পাওয়া যায়নি। এছাড়া চারঘাট উপজেলায় ১০৪ দশমিক ২০০ মেট্রিক টন এবং দুর্গাপুরে ৮ দশমিক ৩৪০ মেট্রিক টন ভিজিএফ ও জিআর চাল বিতরণের কোনো মাস্টাররোল বা ভাউচার দেখাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

ঠিকাদারের সুবিধা ও রাজস্ব ক্ষতি

দুর্গাপুর উপজেলায় এইচবিবি রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করার পরও ঠিকাদারের কাছ থেকে ৬৮ হাজার ৫১০ টাকা বিলম্ব মাশুল আদায় করা হয়নি। এছাড়া ওই উপজেলায় প্রায় ৭৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকার রাস্তা নির্মাণ কাজের কোনো কারিগরি নথি সংরক্ষিত ছিল না।

অন্যদিকে, বাঘা উপজেলায় কম্বল ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ১০% ভ্যাট কাটার কথা থাকলেও কাটা হয়েছে ৭ দশমিক ৫%, যা সরকারের ৬ হাজার ২৫০ টাকা রাজস্ব ক্ষতি করেছে।

অব্যয়িত অর্থ ফেরত না দেওয়া

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাগমারা, মোহনপুর ও পুঠিয়া উপজেলায় প্রকল্পের কাজ শেষে অব্যয়িত কয়েক লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়নি, যা গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোকে এই অনিয়মগুলোর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব ও প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে চিঠিতে সতর্ক করা হয়েছে।

জানতে চাইলে পবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরাফাত আমান আজিজ বলেন, আমরা এখনও এই চিঠি পাইনি। পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাই সরকার বলেন, অডিটের বিষয়ে আমরা কোনো কথা বলতে পারবো না। আপনাদের কোনো তথ্য দিতে পারবো না। এটি সারাজীবন অপত্তি থাকবে। আমরাও জবাব দিতে থাকবো।

এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক অফিয়া আখতারের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এফএ/জেআইএম