সবজি, চাটনি বা ডাল - ধনিয়া পাতা ছাড়া অনেকের কাছে যেন স্বাদই অসম্পূর্ণ। আবার কিছু মানুষ আছেন, যাদের কাছে ধনিয়া পাতার গন্ধ সাবান বা ডিটারজেন্টের মতো বিরক্তিকর লাগে, স্বাদও লাগে অসহ্য। তবে এটি কি কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ? নাকি এর পেছনে আছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা?
আসলে বিষয়টি একেবারেই জেনেটিক। বিজ্ঞানীদের মতে, ধনেপাতার স্বাদ সহ্য করতে না পারার প্রধান কারণ হলো আমাদের শরীরে থাকা একটি নির্দিষ্ট একটি জিন, যার নাম ওআর৬এ২। এই জিনটি আমাদের মস্তিষ্কে ঘ্রাণ নেওয়ার সংকেত পাঠাতে সাহায্য করে।
যাদের শরীরে এই জিনের একটি নির্দিষ্ট সংস্করণ বা ভ্যারিয়েন্ট থাকে, তারা ধনিয়া পাতার ভেতরে থাকা অ্যালডিহাইড নামক রাসায়নিকের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হন। অ্যালডিহাইড এমন একধরনের যৌগ যা সাবান ও ডিটারজেন্টের মতো ক্লিনিং এজেন্টে পাওয়া যায়।
ধনিয়া পাতার মধ্যেও এমন অ্যালডিহাইড যৌগ থাকে, বিশেষ করে ই-টু-ডেসেনাল ও ডোডেকানাল। কারো কারো ঘ্রাণগ্রাহী রিসেপ্টর তাদের ওআর৬এ২ জিনের কারণে এই অ্যালডিহাইডের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। ফলে ধনিয়া পাতার সতেজ গন্ধ তাদের কাছে তীব্র ও অপ্রীতিকর লাগে। কারণ, তাদের মস্তিষ্কে ধনিয়া পাতার গন্ধকে সতেজ নয়, বরং সাবানজাতীয় হিসেবে ডিকোড করে।
আরেকটি জিনোম-ওয়াইড অ্যাসোসিয়েশন স্টাডি, যা পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জেনেটিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ২৩অ্যান্ডমি, দেখায় যে - ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত মানুষের মধ্যে ধনিয়া পাতা অপছন্দের হার তুলনামূলক বেশি। অর্থাৎ, খাদ্যরুচি শুধু সংস্কৃতি বা অভ্যাসের বিষয় নয়; জিনগত পার্থক্যও বড় ভূমিকা রাখে।
আমাদের মস্তিষ্ক প্রাকৃতিকভাবেই তেতো বা সাবান জাতীয় স্বাদকে বিষাক্ত বা বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করতে শেখে। তাই যাদের জিনে এই সংবেদনশীলতা আছে, তাদের শরীর অবচেতনভাবেই ধনেপাতাকে প্রত্যাখ্যান করেন ও অখাদ্য মনে করেন।
তবে বিষয়টি শতভাগ জেনেটিক নয়। স্বাদের অভ্যাস গড়ে ওঠে অভিজ্ঞতা, পরিবেশ ও সংস্কৃতির প্রভাবে। দক্ষিণ এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যে ধনিয়া পাতা দৈনন্দিন রান্নায় ব্যবহৃত হওয়ায় অনেকেই ছোটবেলা থেকেই এর স্বাদে অভ্যস্ত হয়ে যান। নিউরোসায়েন্স বলছে, বারবার এই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মস্তিষ্ক নতুন গন্ধ বা স্বাদকে ধীরে ধীরে গ্রহণ করতে শেখে - একেই বলে ফ্লেভার লার্নিং।
তাহলে কি ধনিয়া পাতা অপছন্দ করা মানে আপনি খুঁতখুঁতে? মোটেও নয়। এটি আপনার নাকের রিসেপ্টর ও জিনের স্বাভাবিক বৈচিত্র্য। মজার বিষয় হলো, একই পরিবারের দুই সদস্যেরও এই জিনগত পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে একজন ধনিয়া পাতা ছাড়া খেতে পারেন না, আর অন্যজন প্লেট থেকে তা ফেলে দেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ধনিয়া পাতাকে ঘিরে এই বিভাজন আসলে মানবদেহের জেনেটিক বৈচিত্র্যেরই একটি উদাহরণ। স্বাদের দুনিয়ায় কারও কাছে যা সতেজ, অন্যের কাছে তা সাবান।
সূত্র: ফ্লেভার জার্নাল (২০১২), ২৩অ্যান্ডমি জেনেটিক রিসার্চ রিপোর্ট, নেচার জেনেটিক্স
এএমপি/এমএস