আন্তর্জাতিক

‘ইসরায়েলি মডেলে’ কাশ্মীর চালাচ্ছে মোদীর ভারত

২০১৯ সালের নভেম্বর, নিউইয়র্কে এক বেসরকারি অনুষ্ঠানে ভারতশাসিত কাশ্মীরে ‘ইসরায়েলি মডেল’ প্রয়োগের আহ্বান জানানোর সময় ক্যামেরাবন্দি হয়েছিলেন ভারতের তৎকালীন কনসাল জেনারেল সন্দীপ চক্রবর্তী। চক্রবর্তী তাঁর বক্তব্যে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের ডানপন্থি ইহুদি বসতি স্থাপনের উদাহরণ টেনে আনেন।

জেনারেল সন্দীপ উল্লেখ করেন, ১৯৮৯ সালে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন শুরুর পর যে কাশ্মীরি হিন্দুরা উপত্যকা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন, তাদের পুনর্বাসনে ভারত সরকার একই পথ অনুসরণ করতে পারে। তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে এটা হয়েছে। ইসরায়েলের জনগণ যদি পারে, আমরাও পারবো। মোদী সরকার ‘দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’।

সেসময় কাশ্মীরজুড়ে কঠোর সামরিক অবরোধ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা চলছিল। এর কয়েক মাস আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার অঞ্চলটির আধা-স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা কেড়ে নেয়, হাজারো মানুষকে গ্রেফতার করে, যাদের মধ্যে কট্টোর ভারতপন্থি নেতারাও ছিলেন।

ছয় বছর পর এসে চক্রবর্তীর কথার প্রতিধ্বনি আরও স্পষ্ট। চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি মোদীর দ্বিতীয় ইসরায়েল সফর সামনে রেখে দুই দেশ এখন শুধু বন্ধুত্ব, বাণিজ্য বা সামরিক সম্পর্কে নয়, অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, শাসনব্যবস্থার নানা ক্ষেত্রেও একে অপরের আদর্শে আরও ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মোদীর আমলে ভারত প্রকাশ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে- ফিলিস্তিনি ইস্যুতে দীর্ঘদিনের অবস্থানকে প্রায় পরিত্যাগ করে। পাশাপাশি ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নীতি থেকে অনেক কৌশল ভারত নিয়ে এসেছে ও ২০১৪ সালে মোদী ক্ষমতায় আসার পর তা দেশীয় নীতিতে প্রয়োগ করেছে।

‘অধিকৃত জনগোষ্ঠী’- একই দৃষ্টিভঙ্গি

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে এক যৌথ আদর্শিক অবস্থান। মোদীর দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শিকড় হিন্দুত্ব মতাদর্শে, যা ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে রূপ দিতে চায় ও বিশ্বব্যাপী সব হিন্দুর জন্য ‘স্বাভাবিক মাতৃভূমি’ হিসেবে দেখে। ইসরায়েলও নিজেকে একইভাবে ইহুদিদের মাতৃভূমি হিসেবে দেখে।

২০২৩ সালে প্রকাশিত ‘হসটাইল হোমল্যান্ডস: দ্য নিউ অ্যালাইন্স বিটউউন ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইসরায়েল’ বইয়ের লেখক আজাদ এসা কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, মোদীর আমলে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক এমন দুই মতাদর্শের মিলন, যাদের দৃষ্টিতে নিজেদের সভ্যতার প্রকল্প এবং মুসলমানরা জনসংখ্যাগত ও নিরাপত্তাজনিত হুমকি।

তিনি বলেন, তাদের বন্ধুত্ব টিকে আছে কারণ মোদী ও নেতানিয়াহুর লক্ষ্য এক ধরনের। আর তা হলো ‘শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতি।’ বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলি নীতি অনুসরণের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ হলো মোদীর দল বিজেপির ‘বুলডোজার রাজনীতি’।

গত এক দশকে বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে শত শত মুসলমানের ঘরবাড়ি ও দোকান ভেঙে ফেলা হয়েছে; বহু মসজিদও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো নোটিশ ছাড়া। ধর্মীয় উত্তেজনা বা সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পরপরই এসব অভিযান চলে। কখনো কখনো স্থানীয় কোনো তুচ্ছ বিবাদ ধর্মীয় রূপ নিলেও বুলডোজার দিয়ে বসতি ভাঙা হয়েছে।

উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এখন তার সমর্থকদের কাছে ‘বুলডোজার বাবা’ নামেও পরিচিত।

ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে হাজারো ঘরবাড়ি ভেঙে বসতি স্থাপনের মাধ্যমে যে দখলদারিত্বের কৌশল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে, তারই ছায়া দেখা যায় এই ‘বুলডোজার নীতিতে’। গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক অভিযানে প্রায় সব ঘরবাড়ি, অফিস, হাসপাতাল, স্কুল ও উপাসনালয় ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার জাতীয়তাবাদ ও সংঘাত নিয়ে গবেষক সুমন্ত্র বোস বলেন, বিজেপির আদর্শিক সংগঠন আরএসএস প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ইসরায়েল-সমর্থনে শিক্ষিত হয়েছে। মোদিও এর অংশ। ইসরায়েলি মডেলকে তারা ভারতের কাঠামোয় বসিয়ে দিচ্ছে।

নজরদারি, সামাজিকভাবে বয়কট ও বাড়তে থাকা দমননীতি

ভারতে সাম্প্রতিক বছরে মুসলমানরা ক্রমবর্ধমান সামাজিক বয়কটের মুখে পড়েছে। বাড়ি ভাড়া পাওয়া কঠিন হয়েছে, স্কুলে মুসলিম শিশুদের হয়রানি বেড়েছে ও হামলার কারণে বহু গ্রাম থেকে এই ধর্মের মানুষেরা পালাতে বাধ্য হয়েছে।

২০২৪ সালের নভেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নোটিশ ছাড়া ভাঙচুরকে বেআইনি ঘোষণা করলেও মাঠপর্যায়ে কোনো পরিবর্তন হয়নি। একা আজাদ এসার মতে, ঘরবাড়ি ভাঙা ভারত ও ইসরায়েল উভয়ের কাছে একটি রাজনৈতিক বার্তা: কে দেশটির অংশ, আর কে ‘বহিরাগত’।

নিরাপত্তা নীতি ও অস্ত্রচুক্তি: ঘনিষ্ঠ সঙ্গী

ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের প্রথমভাগেই রয়েছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। ইসরায়েলি অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলো ভারত। পাশাপাশি গাজায় চলমান অভিযানে ভারত ইসরায়েলকে অস্ত্রও পাঠিয়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েল ভারতীয় সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, সঙ্গে সরবরাহ করেছে ইউএভি, বিমান প্রতিরক্ষা, উন্নত রাডার ও নজরদারি ব্যবস্থা।

এমনকি, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতির প্রভাব ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ছড়িয়ে আছে।

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারতশাসিত কাশ্মীরের পাহালগামে বন্দুকধারীর হামলায় ২৬ পর্যটক নিহত হওয়ার পর ভারত পাকিস্তান ও পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরে বিমান হামলা চালায়। চার দিন ধরে দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বহু আলোচনায় ইসরায়েলি উদাহরণ উঠে আসে।

এক জনপ্রিয় টিভি সঞ্চালক বলেন, ২২ এপ্রিল ভারতের জন্য যা, ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের জন্য তাই। এক অতিথি মন্তব্য করেন, আমরা পাকিস্তানকে গাজায় রূপ দিতে চাই। ভারতীয় পুলিশের সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তা একটি হিন্দি পত্রিকায় বলেন, আমাদের ইসরায়েলের মতো জবাব দিতে হবে।

পেগাসাস ও সর্বগ্রাসী নজরদারি

ইসরায়েলি কোম্পানি এনএসও গ্রুপের তৈরি কুখ্যাত স্পাইওয়্যার পেগাসাস ভারতের সঙ্গে বিতর্কিতভাবে যুক্ত। দ্য ওয়ায়ারের সহপ্রতিষ্ঠাতা সিদ্ধার্থ ভারদারাজনসহ ভারতের বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে এই স্পাইওয়্যার দিয়ে নজরদারির অভিযোগ ওঠে, যা কি না ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের একটি গোপন প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশ ছিল।

ভারদারাজন বলেন, এই প্রযুক্তি একটি স্মার্টফোনকে ব্যক্তিগত গুপ্তচর যন্ত্রে পরিণত করতে পারে। গোপনে ভিডিও, অডিও ও ছবি সংগ্রহ করতে পারে। তিনি যোগ করেন, ইসরায়েলের এই মডেল সম্ভাব্য বিরোধীদের ওপর সর্বক্ষণ নজরদারি চালাতে অত্যন্ত কার্যকর আর মোদী সরকার এটি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে গ্রহণ করেছে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করলেও সরকার সহযোগিতা না করায় পেগাসাস ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি।

তবু ভারদারাজনের মতে, ভারত দমননীতির বহু কৌশল সহসাই গ্রহণ করেছে। ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞায় ভারত এখন গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে শীর্ষ স্থানে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকে ভারতের গণতান্ত্রিক মানও ক্রমাগত নিচে নেমেছে।

তিনি বলেন, ইসরায়েল যে পদ্ধতি দখলকৃত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করে, একই নীতি এখন মোদী সরকার দেশের নিজস্ব নাগরিকদের বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করছে। এটাই সবচেয়ে দুঃখজনক।

সূত্র: আল-জাজিরা

এসএএইচ