বিশ্বজুড়ে বিক্রি হওয়া মেডজুল খেজুরের ৫০ শতাংশই ইসরায়েলি পণ্য, যা চাষ হয় মূলত দখল করা ফিলিস্তিনি ভূমিতে। তবে বিক্রির সময় এই তথ্যটি গোপন করা হয়। কৌশলে শুধু ‘ইসরায়েলি পণ্য’ বা অন্য কোনো উৎসের নামে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বিশ্ববাজারে।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা। একই তথ্য নিশ্চিত করেছে তুর্কি সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সিও।
আল-জাজিরা জানিয়েছে, জর্ডান সীমান্তবর্তী পশ্চিম তীরের জেরিকো অঞ্চলে বিশাল এলাকা দখল করে মেডজুল খেজুরের চাষ করছে ইসরায়েলিরা।
দখল করা ভূমিতে খেজুর চাষকয়েক দশক ধরে পশ্চিম তীরে তীব্র পানি সংকট তৈরি করে রেখেছে ইসরায়েল। আর তার নেপথ্যে রয়েছে মেডজুল খেজুর চাষ।
আরও পড়ুন>>পরিচয় লুকিয়ে ভিন্ন লেবেলে বিক্রি হচ্ছে ইসরায়েলি খেজুরবাংলাদেশের বাজারে আমেরিকান খেজুর-বাদাম দেখে খুশি মার্কিন রাষ্ট্রদূতভালো খেজুর চিনবেন যেভাবে
১৯৮৯ সালে পশ্চিম তীরে প্রথমবারের মতো মেডজুল খেজুর চাষ শুরু করেন অবৈধ ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা। এই জাতের খেজুর গাছের জন্য প্রচুর পরিমাণে পানির প্রয়োজন হয়। একেকটি গাছ দৈনিক প্রায় ১৮০ লিটার পানি শোষণ করতে পারে।
ফলে ইসরায়েলের লাগানো বিপুল সংখ্যক মেডজুল খেজুর গাছের কারণে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কৃষকদের জন্য চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
পরিচয় লুকিয়ে রপ্তানিফিলিস্তিনের দখল করা ভূমিতে চাষ করায় ইসরায়েলি এসব মেডজুল খেজুর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিচয় লুকিয়ে বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। এর প্যাকেজিংয়ে কখনো শুধু ‘ইসরায়েলি পণ্য’ অথবা ‘জর্ডান উপত্যকার পণ্য’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অথচ বাস্তবে সেগুলো দখল করা অবৈধ জমির ফসল। আর এই ব্যবসার পুরো মুনাফা যায় ইসরায়েলের কাছে।
এসব ইসরায়েলি মেডজুল খেজুর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আরব দেশগুলোসহ প্রায় সারা বিশ্বেই রপ্তানি হয়।
ইউরোপের আইন অনুযায়ী, ইসরায়েলি দখল করা ভূমি থেকে আসা পণ্যকে কেবল ‘ইসরায়েলি পণ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা যথেষ্ট নয়; ভোক্তাকে বিভ্রান্তি এড়াতে উৎস স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। তবে ইসরায়েলি মেডজুল খেজুরের ক্ষেত্রে এই আইন প্রায়ই মানা হচ্ছে না।
অভিযোগ অনুযায়ী, মধ্যবর্তী দেশ বা জটিল লজিস্টিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইউরোপে পাঠানো হচ্ছে ইসরায়েলি মেডজুল খেজুর। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ঢোকার সময় এসব পণ্য কেবল ‘ইসরায়েলি পণ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় বা প্রতিবেশী দেশের উৎস হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
কিছু রপ্তানিকারক মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলে পণ্য পুনঃপ্যাকেটজাত করেন বা মধ্যবর্তী দেশের মাধ্যমে রুট পরিবর্তন করেন। এর ফলে উৎপাদনস্থল আড়ালেই থেকে যায়।
‘ডেট লন্ডারিং’বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডসে বিক্রি হওয়া খেজুরের প্রায় অর্ধেক এবং ফ্রান্সে এক-তৃতীয়াংশের বেশি ইসরায়েলি উৎসের। এই দুই দেশ ইউরোপে প্যাকেজিং ও পুনঃরপ্তানির কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে। জার্মানিতে মোট খেজুর সরবরাহের আনুমানিক ২৫ শতাংশ ইসরায়েল-সম্পর্কিত পণ্য বলে ধারণা করা হয়।
উন্নয়নশীল দেশ থেকে আমদানি প্রসারে কাজ করা সংস্থা সিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপে রপ্তানি করা মেডজুল খেজুরের প্রায় ৫০ শতাংশ ইসরায়েল থেকে আসে। আন্তর্জাতিক খাদ্যবাণিজ্য বিষয়ক কিছু প্রকাশনা এই হার ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করেছে।
খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল বছরে প্রায় ৩৫ হাজার টন খেজুর রপ্তানি করে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানার ভেতরে উৎপাদন মাত্র ৮ হাজার ৮০০ টনের মতো, যা চাষ হয় মূলত আরাভা উপত্যকায়। যদি এই পরিসংখ্যান সঠিক হয়, তাহলে ইসরায়েলি খেজুর রপ্তানির প্রায় ৭৫ শতাংশ দখল করা ফিলিস্তিনি ভূমি থেকে আসতে পারে বলে ধারণা করা যায়।
সমালোচকরা এ ধরনের ঘটনায় ‘ডেট লন্ডারিং’ শব্দটি ব্যবহার করছেন। এক্ষেত্রে অবৈধ বসতিতে উৎপাদিত খেজুর নেদারল্যান্ডস, মরক্কো, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ফিলিস্তিনের লেবেলে বাজারজাত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বসতির ইসরায়লি পণ্য ফিলিস্তিনি সরবরাহ ব্যবস্থায় মিশিয়ে দেওয়া হয় বলেও দাবি উঠেছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ অতীতে এ ধরনের ঘটনা রোধে পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০১৪ সালে ফিলিস্তিনি জাতীয় অর্থনীতি মন্ত্রণালয় ‘ফিলিস্তিনি পণ্য’ লেবেলে বিক্রির উদ্দেশ্যে আনা ২০ টন ইসরায়েলি খেজুর জব্দ করে। পরে বছরগুলোতেও একই ধরনের তদন্তের খবর পাওয়া গেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা, আনাদোলু এজেন্সিকেএএ/