পরিচয় লুকিয়ে ভিন্ন লেবেলে বিক্রি হচ্ছে ইসরায়েলি খেজুর

খান আরাফাত আলী
খান আরাফাত আলী খান আরাফাত আলী , সহ -সম্পাদক
প্রকাশিত: ০৪:৪০ পিএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পরিচয় লুকিয়ে বিক্রি হচ্ছে ইসরায়েলি খেজুর/ প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বিশ্বজুড়ে খেজুরপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি নাম মেডজুল। বিশেষ করে, রোজার সময় সুস্বাদু ও পুষ্টিকর এই ফলের কদর বেড়ে যায় কয়েকগুণ। তবে জেনে অনেকেই অবাক হবেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মেডজুল খেজুরের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী ইসরায়েল। ফিলিস্তিনের দখল করা জমিতে চাষ করে পরিচয় লুকিয়ে সারাবিশ্বে এই খেজুর রপ্তানি করছে ইসরায়েলিরা।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদন বলছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যত মেডজুল খেজুর খাওয়া হয়, তার ৫০ শতাংশই আসে ইসরায়েল থেকে। আর এসব খেজুরের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চাষ হয় ফিলিস্তিনের দখল করা ভূমিতে।

জর্ডান সীমান্তবর্তী পশ্চিম তীরের জেরিকো অঞ্চলে বিশাল এলাকা দখল করে মেডজুল খেজুরের বাগান গড়ে তুলেছে ইসরায়েলিরা।

আরও পড়ুন>>
মেডজুল খেজুরের ৫০ শতাংশই ইসরায়েলি, চাষ দখল করা ভূমিতে
বাংলাদেশের বাজারে আমেরিকান খেজুর-বাদাম দেখে খুশি মার্কিন রাষ্ট্রদূত
ভালো খেজুর চিনবেন যেভাবে

মোহাম্মদ সেলিম নামে এক ফিলিস্তিনি খেজুর বিক্রেতা বলেন, অবশ্যই এগুলো ফিলিস্তিনি ভূমি। তারা আমাদের জমি দখল করে সেখানে খেজুর চাষ করেছে।

পরিচয় লুকিয়ে রপ্তানি

ফিলিস্তিনের দখল করা ভূমিতে চাষ করায় ইসরায়েলি এসব মেডজুল খেজুর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিচয় লুকিয়ে বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। এর প্যাকেজিংয়ে কখনো শুধু ‘ইসরায়েলি পণ্য’ অথবা ‘জর্ডান উপত্যকার পণ্য’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অথচ বাস্তবে সেগুলো দখল করা অবৈধ জমির ফসল। আর এই ব্যবসার পুরো মুনাফা যায় ইসরায়েলের কাছে।

এসব ইসরায়েলি মেডজুল খেজুর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আরব দেশগুলোসহ প্রায় সারা বিশ্বেই রপ্তানি হয়।

ইউরোপের আইন অনুযায়ী, ইসরায়েলি দখল করা ভূমি থেকে আসা পণ্যকে কেবল ‘ইসরায়েলি পণ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা যথেষ্ট নয়; ভোক্তাকে বিভ্রান্তি এড়াতে উৎস স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

তবে ইসরায়েলি মেডজুল খেজুরের ক্ষেত্রে এই আইন প্রায়ই মানা হচ্ছে না।

অভিযোগ অনুযায়ী, মধ্যবর্তী দেশ বা জটিল লজিস্টিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইউরোপে পাঠানো হচ্ছে ইসরায়েলি মেডজুল খেজুর। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ঢোকার সময় এসব পণ্য কেবল ‘ইসরায়েলি পণ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় বা প্রতিবেশী দেশের উৎস হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

কিছু রপ্তানিকারক মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলে পণ্য পুনঃপ্যাকেটজাত করেন বা মধ্যবর্তী দেশের মাধ্যমে রুট পরিবর্তন করেন। এর ফলে উৎপাদনস্থল আড়ালেই থেকে যায়।

বৈশ্বিক খেজুর বাজার

২০২৫ সালে বৈশ্বিক খেজুর বাজারের মূল্য ধরা হয়েছে ৩২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালে এটি বেড়ে ৩৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ ধরে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাজারের আকার ৫৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খেজুরের বৈশ্বিক বাজারে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা। বছরে ৯০ লাখ টনের বেশি ফসল উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে ২০২৫ সালে অঞ্চলটি বিশ্ববাজারের ৮৫ দশমিক ২৮ শতাংশ দখল করে। ২০২৫ সালে এ অঞ্চলের বাজারমূল্য ছিল ২৭ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালে বেড়ে ২৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।

অঞ্চলটির প্রধান উৎপাদক ও ভোক্তা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে তিউনিসিয়া, ইরান, ইসরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও মিশর। মিশর বছরে ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন টনের বেশি উৎপাদন নিয়ে শীর্ষে। সৌদি আরব উৎপাদন করে দেড় মিলিয়ন টনের বেশি, ইরান ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন টনের বেশি এবং আলজেরিয়া ১ দশমিক ১ মিলিয়ন টনের বেশি।

উৎপাদনের দিক থেকে ইসরায়েল মিশর বা সৌদি আরবের তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও উচ্চমূল্যের প্রিমিয়াম ‘মেডজুল’ জাতের খেজুর রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে তাদের উৎপাদন ও রপ্তানি পরিসংখ্যানের মধ্যে অমিল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল বছরে প্রায় ৩৫ হাজার টন খেজুর রপ্তানি করে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানার ভেতরে উৎপাদন মাত্র ৮ হাজার ৮০০ টনের মতো, যা চাষ হয় মূলত আরাভা উপত্যকায়। যদি এই পরিসংখ্যান সঠিক হয়, তাহলে ইসরায়েলি খেজুর রপ্তানির প্রায় ৭৫ শতাংশ দখল করা ফিলিস্তিনি ভূমি থেকে আসতে পারে বলে ধারণা করা যায়।

সূত্র: আল-জাজিরা, আনাদোলু এজেন্সি
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।