ফিচার

জর্জ হ্যারিসন: কীভাবে ভিনদেশী মানুষটি বাঙালির পরম বন্ধু হলেন

সময়টা ১৯৭১, পৃথিবীর মানচিত্রের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি অংশ যেখানে তাদের জন্ম, সেই জন্মভূমি, মাতৃভাষা রক্ষা করার জন্য একটি জাতি জীবন দিচ্ছে। চলছে যুদ্ধের দামামা। তখনই পৃথিবীর মানচিত্রে তাদের নামনেই। অন্য এক দেশের অংশ হিসেবে পরিচিত তখনো বিশ্ব দরবারে। কিন্তু তারা নিজেদের পরিচয় তৈরিতে, মাতৃভূমি রক্ষায় রক্ত, সম্ভ্রম, জীবন দিয়ে যাচ্ছে।

যখন এই জাতি জন্মভূমি রক্ষায় যুদ্ধ করছে শত্রুর সঙ্গে ঠিক সেই সময়, তাদের থেকে ৮ হাজার কিলোমিটার দূরে বসে একজন তাদের জন্য ফান্ড সংগ্রহ করছেন। যুদ্ধের দামামা তার মনে বিষাদের আধার নামিয়েছিল। তিনি জর্জ হ্যারিসন। যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া বিংশ শতাব্দীর অত্যন্ত প্রতিভাবান একজন জনপ্রিয় গায়ক এবং গিটারিস্ট। জর্জ হ্যারিসন ষাটের দশকেই খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছান। তবে তিনি কেবল জনপ্রিয়তার শিল্পী ছিলেন না; তার ব্যক্তিত্বে ছিল গভীর মানবিকতা ও আধ্যাত্মিক অনুরাগ।

১৯৬০ এর মাঝামাঝি সময় থেকে হ্যারিসন ভারতীয় সংস্কৃতি প্রতি আকৃষ্ট হন। সেই সুবাদেই তার পরিচয় ভারতীয় বাঙালি সঙ্গীতজ্ঞ পণ্ডিত শংকরের সঙ্গে। এই বন্ধুত্বই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের দুর্দশার খবর তার কাছে পৌঁছে দেয়। রবি শঙ্কর তাকে জানান, পূর্ববাংলায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় চলছে এবং শরণার্থীদের জন্য জরুরি সহায়তা প্রয়োজন।

এই সংবাদ হ্যারিসনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, শুধু বিবৃতি দিয়ে নয়, বড় পরিসরে কিছু করতে হবে। তার উদ্যোগেই ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ। এটি ছিল বিশ্বের প্রথম বৃহৎ চ্যারিটি কনসার্টগুলোর একটি, যেখানে সংগীতকে মানবিক সহায়তার শক্তিতে রূপ দেওয়া হয়। কনসার্টে ৪০ হাজারের বেশি দর্শক উপস্থিত ছিলেন। কনসার্ট ও অন্যান্য অনুষঙ্গ হতে প্রাপ্ত অর্থ সাহায্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২,৪৩,৪১৮.৫১ মার্কিন ডলার, যা ইউনিসেফের মাধ্যমে শরণার্থীদের সাহায্যার্থে ব্যয় হয়।

শুধু কনসার্ট আয়োজনেই তিনি থেমে থাকেননি। ‘বাংলা দেশ’ নামে একটি গান রচনা ও প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি সরাসরি বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। সেই সময় পশ্চিমা বিশ্বের অনেক মানুষের কাছেই ‘বাংলাদেশ’ নামটি অপরিচিত ছিল। হ্যারিসনের গান ও কনসার্টের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল আঞ্চলিক সংকট হিসেবে নয়, বৈশ্বিক মানবিক ইস্যু হিসেবে আলোচিত হতে শুরু করে।

বাংলাদেশের জন্য তার এই অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ মানবিক প্রেরণা থেকে। তিনি কোনো রাজনৈতিক লাভের আশায় এগিয়ে আসেননি; বরং নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে নিজের নৈতিক দায়িত্ব মনে করেছিলেন। সংগীতকে তিনি প্রতিবাদের ভাষা ও সহমর্মিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এ কারণেই তার অবদান কেবল অর্থ সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি বিশ্বজনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার গল্প নয়; এটি মানবতা, ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক সংহতিরও ইতিহাস। ১৯৭১ সালে যখন পূর্ববাংলায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়, অসংখ্য নিরীহ প্রাণ ঝরে যায় এবং প্রায় এক কোটি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়, তখন বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী রাষ্ট্র নীরব ছিল। কিন্তু সেই সময় দূরদেশের এক সংগীতশিল্পী মানবতার পক্ষে উচ্চকণ্ঠ হয়ে ওঠেন তিনি ছিলেন জর্জ হ্যারিসন। এ কারণেই বাঙালি জাতি তাকে বাংলাদেশের পরম বন্ধু হিসেবে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করে কৃতজ্ঞতা জানায়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির চেয়েও বড় বিষয় হলো মানুষের হৃদয়ে তার স্থান। বাঙালি জাতি তাকে মনে রাখে সেই শিল্পী হিসেবে, যিনি হাজার মাইল দূরে বসেও তাদের কান্না শুনেছিলেন এবং বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিলেন।

আজ স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে জর্জ হ্যারিসনের নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধায়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, একজন শিল্পীর কণ্ঠও একটি জাতির সংগ্রামে শক্তি যোগাতে পারে। তাই জর্জ হ্যারিসন কেবল বিটলসের সদস্য নন তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল মানবিক অধ্যায়, যাকে বাঙালি জাতি কখনও ভুলবে না।

আরও পড়ুনতিস্তার চরে স্বপ্নের আলো জ্বালাচ্ছে ‘লালমনি বিদ্যাপীঠ’শোলার তৈরি ফুলেই সংসার চলছে রেখা বিশ্বাসের

কেএসকে