একই প্রতিষ্ঠানে ২০-২৫ বছর কাজ করা একসময় ছিল গর্বের বিষয়। লয়্যাল কর্মী মানেই নির্ভরযোগ্য মানুষ - এমন ধারণা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জি, এই সমীকরণে নতুন প্রশ্ন তুলছে।
জেন-জি প্রযুক্তিনির্ভর, তথ্যসচেতন এবং কাজের জায়গায় স্বচ্ছতা ও সম্মান প্রত্যাশা করে। তারা শুধু বেতন নয়, কর্মপরিবেশ, নেতৃত্বের ধরন এবং ব্যক্তিগত সময়কেও সমান গুরুত্ব দেয়।
চাকরি ছাড়ার প্রবণতা: সংখ্যা কী বলছে?পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডেলয়েট-এর ২০২৩ সালের গ্লোবাল জরিপে দেখা গেছে, জেন-জি কর্মীদের বড় একটি অংশ মানসিক চাপ বা মূল্যবোধের অসামঞ্জস্যের কারণে চাকরি পরিবর্তনের কথা ভাবছে। একইভাবে গ্যালপ-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তরুণ কর্মীদের মধ্যে ‘এনগেজমেন্ট’ কম হলে তারা দ্রুত প্রতিষ্ঠান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
এটি কেবল ব্যক্তিগত খেয়াল নয়; বরং কর্মক্ষেত্রে মানসিক নিরাপত্তা ও কাজ-জীবন ভারসাম্যের অভাব বড় কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্য এবং ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন যৌথভাবে প্রকাশিত এক নীতিমালায় বলছে, কর্মক্ষেত্রের দীর্ঘমেয়াদি চাপ উদ্বেগ ও অবসাদের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং অনুপস্থিতি কমায়। অর্থাৎ মানসিক সুস্থতা শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি প্রতিষ্ঠানেরও স্বার্থের সঙ্গে জড়িত।
লয়্যালটি কি একতরফা নাকি পারস্পরিক?আগের প্রজন্মের অনেকেই মনে করেন, প্রতিষ্ঠানের প্রতি অটল থাকা দায়িত্ববোধের অংশ। কিন্তু জেন-জি প্রশ্ন তুলছে, প্রতিষ্ঠান কি সমানভাবে কর্মীর প্রতি লয়্যাল? যদি কর্মীর সুস্থতা, মতামত বা ব্যক্তিগত সময়ের মূল্যায়ন না হয়, তবে একতরফা আনুগত্য কতটা যুক্তিসঙ্গত?
পরামর্শক সংস্থা ম্যাককিনসি অ্যান্ড কোম্পানির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তরুণ কর্মীরা এমন প্রতিষ্ঠানে থাকতে চায় যেখানে মূল্যবোধের মিল, স্বচ্ছ নেতৃত্ব এবং উন্নয়নের সুযোগ থাকে। না হলে তারা বিকল্প খুঁজতে দ্বিধা করে না।
দ্রুত চাকরি ছাড়ার পেছনে আর কী আছে?ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে এখন চাকরি খোঁজা আগের চেয়ে সহজ। রিমোট কাজের সুযোগও বেড়েছে। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমেছে। একই সঙ্গে মহামারির পর অনেকেই জীবন ও কাজের অগ্রাধিকার নতুন করে নির্ধারণ করেছে।
দ্রুত চাকরি বদলকে কেউ কেউ অস্থিরতা হিসেবে দেখলেও, অন্য দৃষ্টিকোণ বলছে - এটি কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর সংস্কৃতির দাবিতে এক ধরনের প্রতিবাদ। প্রতিষ্ঠানগুলো যদি প্রতিভা ধরে রাখতে চায়, তবে শুধু বেতন নয়, সম্মান, নমনীয়তা ও মানসিক নিরাপত্তাকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে।
লয়্যালটি আর মানসিক শান্তির এই টানাপোড়েনে জেন-জি যে প্রশ্ন তুলছে, তা হয়তো অস্বস্তিকর। কিন্তু কর্মজীবনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সূত্র: পিউ রিসার্চ সেন্টার, ডেলয়েট গ্লোবাল জেন-জি অ্যান্ড মিলেনিয়াল সার্ভে ২০২৩, গ্যালাপ রিপোর্ট অন এমপ্লয়ি এনগেজমেন্ট, ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন ও ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন যৌথ নীতিমালা, ম্যাককিনসি অ্যান্ড কোম্পানি
এএমপি/জেআইএম