ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানিকে হত্যার ঘটনায় দেশটির নেতৃত্বে মারাত্মক ধাক্কা লাগবে না বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। বুধবার (১৮ মার্চ) আল-জাজিরাতে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে এই কথা বলতে শোনা যায় আরাগচিকে।
সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখনো বুঝতে পারেনি যে ইরানের সরকার কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।
তিনি বলেন, আমি জানি না কেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখনো এই বিষয়টি বুঝতে পারেনি যে, ইরানের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামো রয়েছে। এখানে সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান ও একজন ব্যক্তির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি এই কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলে না।
আরাগচি বলেন, অবশ্যই ব্যক্তিরা প্রভাবশালী ও প্রত্যেকে তাদের নিজ নিজ ভূমিকা পালন করেন। কেউ ভালো, কেউ কম ভালো, কেউ কম গুরুত্বপূর্ণ’; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কাঠামো।
তিনি ইঙ্গিত দেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার মতো এত বড় জাতীয় ক্ষতির পরও সব ‘ব্যবস্থা চালু ছিল।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আলী খামেনির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কেউ ছিলেন না। সেই নেতাও শহীদ হয়েছেন, তবুও ‘ব্যবস্থা’ তার কাজ চালিয়ে গেছে ও সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি অন্য কেউ শহীদ হন, তখনও একই পরিস্থিতি হবে।
তিনি যোগ করেন, যদি কোনো সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রীও শহীদ হন, শেষ পর্যন্ত অন্য কেউ এসে সেই দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
৬৭ বছর বয়সী লারিজানি, নিহত আলী খামেনি এবং তার ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সোমবার (১৬ মার্চ) রাতে এক হামলায় লারিজানি নিহত হন। এই ঘটনা যুদ্ধ শুরুর ১৯ দিনের মধ্যে তেহরানের নেতৃত্বে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ব্যক্তির অপসারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) আরও নিশ্চিত করেছে যে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অধীন প্যারামিলিটারি বাহিনী বাসিজের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলামরেজা সোলেইমানিও ‘আমেরিকান-জায়নবাদী শত্রুর’ হামলায় নিহত হয়েছেন।
গত ছয় বছর ধরে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী বাসিজের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সোলেইমানি, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের পাল্টা লড়াইয়ে একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
আল-জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা বলেন, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের টার্গেট করে হত্যা করে আসছে, যা যুদ্ধের স্বাভাবিক নিয়ম নয়।
তিনি বলেন, যুদ্ধে আপনি রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা দিয়ে শুরু করেন না, এমনকি নির্বাচিত নেতাদেরও না। এই ধরনের হত্যাকাণ্ড গ্যাংস্টারসুলভ, এটি সন্ত্রাসবাদ ও যুদ্ধের স্বাভাবিক নিয়ম নয়।
বিশারা আরও বলেন, ইরানের ব্যবস্থা শক্তিশালী ও একজন নেতার মৃত্যুতে এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে না, তবে এ ধরনের লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের প্রভাব থাকে। কারণ- পরিমাণগত পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত গুণগত পরিবর্তনও ঘটায়।
আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচি আবারও বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বৃহত্তর এলাকায় যে সংঘাত বাড়ছে, তা তেহরানের পছন্দের নয় ও এর জন্য শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী হতে হবে।
তিনি বলেন, আমি আবারও বলছি- এই যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধ নয়। আমরা এটি শুরু করিনি। যুক্তরাষ্ট্র এটি শুরু করেছে এবং এই যুদ্ধের মানবিক ও আর্থিক- সব পরিণতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী। তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতেই হবে।
সূত্র: আল-জাজিরা
এসএএইচ