দেশের ব্যাংক খাতের বড় সমস্যাগুলোর একটি খেলাপি ঋণ। সময়ের সঙ্গে এই সমস্যা ছড়িয়ে পড়ছে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতেও। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের বড় একটি অংশ রয়েছে শিল্প খাতে, আর এই খাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে, যা শিল্প বিনিয়োগসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
প্রতিবেদন বলছে, ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ৪৩ শতাংশই দেওয়া হয়েছে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে। ডিসেম্বর শেষে এই খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৬৪ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
তিন মাসে কিছুটা উন্নতি
তবে গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় শিল্প খাতে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে শিল্প খাতে মোট ঋণের স্থিতি ছিল ৭ লাখ ৫৫ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। সে সময় এই খাতের ৩৭ শতাংশ ঋণ খেলাপি ছিল। সেই হিসাবে তিন মাসে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে।
এক বছরে বেড়েছে খেলাপি ঋণঅন্যদিকে, এক বছরের ব্যবধানে শিল্প খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে শিল্প খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ১২ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। তখন এই খাতের ২২ দশমিক ৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি ছিল। অর্থাৎ এক বছরে খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ।
কেন বাড়ছে খেলাপি ঋণ
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই–বাছাই ছাড়া শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ করা হয়। একই সঙ্গে বড় ও প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী বারবার ঋণ সুবিধা পেয়ে থাকে। রাজনৈতিক প্রভাব বা অন্যান্য কারণে অনেক সময় তারা ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে। ফলে এসব ঋণ আর ফেরত আসে না এবং খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকে।
অন্যদিকে শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বৈশ্বিক সংকটে থমকে যায় দেশের অর্থনীতি। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, বন্ধ হয়ে যায় অনেক শিল্প।
বাংলাদেশের নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ-এর বর্তমান নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, দেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রথম ধাক্কা আসে বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালে। তাছাড়া ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও এর আঁচ লাগে। ওই সময়ে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক উদ্যোক্তা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি। এর ফলে অনেকেই খেলাপির তালিকায় চলে যান।
ব্যবসা ও বাণিজ্য খাত
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ৬২৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৩৩ শতাংশ। এই খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৪২ শতাংশ।
তবে সেপ্টেম্বরের তুলনায় এ খাতে খেলাপি ঋণের হার কমেছে। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৭৪ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশ ঋণ খেলাপি ছিল।
পরিবহন খাত
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পরিবহন খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৪৮৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ০.৫৯ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ২৩ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
নির্মাণ খাত
একই সময়ে নির্মাণ খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৯০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭ শতাংশ। এই খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ২৬ শতাংশ।
ব্যাংকের আর্থিক ঝুঁকি
উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে অনেক ব্যাংক মূলধন ঘাটতির ঝুঁকিতে পড়ছে। এতে কিছু ব্যাংক টিকে থাকতে সরকারের সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি পুরো ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ, তদারকি জোরদার এবং খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপি ঋণ ক্রমাগত বাড়তে থাকলে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট তৈরি হতে পারে। এতে নতুন ঋণ বিতরণ কমে যেতে পারে এবং শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
একই সঙ্গে ঝুঁকি সামাল দিতে ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়াতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দিতে পারে।
বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলক বেশি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, উন্নত দেশগুলোতে সাধারণত খেলাপি ঋণের হার এক অংকের মধ্যে থাকে। সেই তুলনায় বাংলাদেশের উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সাবেক উপাচার্য ড. আব্দুল বায়েস বলেন, উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে অনেক ব্যাংক মূলধন ঘাটতির ঝুঁকিতে পড়ছে। ফলে কিছু ব্যাংক টিকে থাকতে সরকারের সহায়তা নিতে বাধ্য হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ পরিস্থিতি পুরো ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হতে পারে, যা শিল্পে বিনিয়োগসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইএআর/এসএইচএস