ফিচার

ঈদের একাল সেকাল

একটা সময় ঈদ মানেই ছিল উৎসবের গন্ধে ভরা এক দীর্ঘ প্রস্তুতি। রমজানের শেষ দশ দিন থেকেই গ্রামবাংলার বাজারগুলো জমে উঠত ঈদকে ঘিরে নানা আয়োজন আর রঙিন সামগ্রীর বাহারে। ছোট ছোট দোকানের সামনে ঝুলত রঙিন ঈদ কার্ড, জরির পোস্টার, কাগজের ব্যানার সবকিছুর উপর লেখা থাকত একটি পরিচিত বাক্য, ‘ঈদ মোবারক’। সেই দৃশ্য আজ প্রায় স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। মাত্র এক দশক আগেও যে দৃশ্যগুলো ছিল গ্রামীণ ঈদ সংস্কৃতির অঙ্গ, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

ঈদ কার্ডের রঙিন দিন

এক দশক আগেও ঈদ এলেই বাজারে দেখা যেত ঈদ কার্ডের বাহার। ছোট থেকে বড় সব বয়সি মানুষই প্রিয়জনদের জন্য কার্ড কিনতেন। কেউ পাঠাতেন ডাকযোগে, কেউবা হাতে হাতে পৌঁছে দিতেন। ঈদ কার্ডগুলোতে থাকত রঙিন ফুল, চাঁদ-তারা, মসজিদের নকশা, কখনো আবার কবিতার পঙক্তি। কার্ড খুললেই ভেতরে লেখা থাকত আন্তরিক শুভেচ্ছা ‘ঈদ মোবারক’, ‘শুভ ঈদের শুভেচ্ছা’ কিংবা নিজের হাতে লেখা কয়েকটি ভালোবাসার বাক্য।

একটি ছোট্ট কাগজের কার্ড যেন হয়ে উঠত আবেগের বাহক। অনেকেই সেই কার্ড বছরের পর বছর যত্ন করে রেখে দিতেন স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন ঈদের শুভেচ্ছা পৌঁছে যায় কয়েক সেকেন্ডেই। মোবাইল ফোনের এসএমএস, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট সবকিছুই মুহূর্তের মধ্যে শুভেচ্ছা জানিয়ে দেয়। এতে যোগাযোগ সহজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু হারিয়ে গেছে সেই হাতে লেখা শুভেচ্ছার উষ্ণতা।

ঘর সাজানোর উৎসব

আগের ঈদে ঘর সাজানোও ছিল উৎসবের বড় অংশ। গ্রামের বাজারে বিক্রি হতো ‘ঈদ মোবারক’ লেখা জরির পোস্টার, কাগজের ব্যানার কিংবা রঙিন ফেস্টুন। বাড়ির দরজা, দেয়াল বা বসার ঘরে সেগুলো টানিয়ে রাখা হতো ঈদকে স্বাগত জানাতে। শিশু-কিশোররা নিজেরাও রঙিন কাগজে লিখে বানাত ‘ঈদ মোবারক’ সাইনবোর্ড।

দোকানপাটেও দেখা যেত বিশেষ সাজসজ্জা। ককসিট বা দোকানের সামনে টানানো থাকত বড় বড় সাইনবোর্ড ‘ঈদ মোবারক’। অনেক দোকানে আবার রঙিন বাতি বা কাগজের ফুল দিয়ে সাজানো হতো। এখন সেই দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়ে না। আধুনিক ব্যানার, ডিজিটাল প্রিন্ট কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা জানানোর প্রবণতা বাড়ায় ঐতিহ্যবাহী এসব সাজসজ্জা প্রায় বিলুপ্ত।

গ্রামীণ ঈদের সামাজিকতা

এক সময় ঈদের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল মানুষের মিলনমেলা। গ্রামের মানুষ ঈদের দিন সকালে নতুন পোশাক পরে একসঙ্গে ঈদগাহে যেতেন। নামাজ শেষে শুরু হতো কোলাকুলি আর শুভেচ্ছা বিনিময়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সালাম করা, বড়দের কাছ থেকে ‘ঈদি’ পাওয়া, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে দাওয়াত এসব ছিল ঈদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজও এসব কিছু আছে, তবে আগের মতো প্রাণবন্ত নয়। অনেকেই ঈদের দিনটিতে ব্যস্ত থাকেন স্মার্টফোনে ছবি তোলা, পোস্ট করা কিংবা অনলাইনে সময় কাটাতে।

প্রযুক্তির যুগে বদলে যাওয়া শুভেচ্ছা

প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন প্রবাসে থাকা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে ভিডিও কলে মুহূর্তেই ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়। একটি বার্তা বা একটি পোস্টের মাধ্যমে একসঙ্গে শত শত মানুষকে শুভেচ্ছা জানানো সম্ভব। ফলে সময় বাঁচে, যোগাযোগও দ্রুত হয়। কিন্তু এর মাঝেই হারিয়ে গেছে কিছু আবেগঘন মুহূর্ত। হাতে লেখা কার্ডের অনুভূতি, ডাকপিয়নের অপেক্ষা, কিংবা প্রিয়জনের কাছ থেকে পাওয়া ছোট্ট শুভেচ্ছাবার্তার আনন্দ এসব এখন অনেকটাই অতীত।

উৎসবের বাণিজ্যিক রূপ

আগে ঈদের কেনাকাটা সীমাবদ্ধ ছিল প্রয়োজনের মধ্যেই। নতুন পোশাক, সেমাই, কিছু মিষ্টি আর ঘর সাজানোর সামান্য আয়োজনেই উৎসব পূর্ণতা পেত। এখন ঈদকে ঘিরে বিশাল বাণিজ্যিক আয়োজন তৈরি হয়েছে। বড় বড় শপিং মল, অনলাইন শপ, ফ্যাশন ব্র্যান্ড সবকিছুই ঈদকে কেন্দ্র করে বিশেষ প্রচারণা চালায়।গ্রামেও এখন শহরের মতোই আধুনিক বাজারের প্রভাব পড়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী অনেক উপকরণই হারিয়ে গেছে আধুনিক পণ্যের ভিড়ে।

গ্রামীণ ঈদেও শহুরে সংস্কৃতির ছোঁয়া

এখনকার গ্রামীণ ঈদেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে শহুরে সংস্কৃতির ছোঁয়া। একসময় ঈদের বিকেল মানেই ছিল গ্রামে ছোট ছোট আয়োজন কোথাও উঠোনে বা মাঠে সাজানো হতো অস্থায়ী মঞ্চ, সেখানে স্থানীয় তরুণরা গান গাইত, কেউ কবিতা আবৃত্তি করত, আবার কোথাও চলত হাসি-আড্ডায় ভরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গ্রামের খোলা মাঠে বা উঠোনে বসত আড্ডা। কেউ গল্প করতেন, কেউ খেলতেন লুডু বা ক্যারাম। অনেক জায়গায় শিশু-কিশোরদের জন্য আয়োজন হতো গ্রামীণ খেলাধুলার।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আয়োজনগুলো অনেকটাই হারিয়ে গেছে। এখন ঈদের দিনে গ্রামের অনেক মানুষই ঘরের ভেতর টেলিভিশনের সামনে বসে সময় কাটান। বিভিন্ন চ্যানেলের ঈদ বিশেষ অনুষ্ঠান, নাটক বা সিনেমা দেখতেই কেটে যায় দিনের বড় একটি অংশ। ফলে আগের মতো উঠোনভরা আড্ডা, গ্রামীণ মঞ্চে গান গাওয়া কিংবা সবাই মিলে আয়োজন করার যে সামাজিক আনন্দ ছিল, তা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। গ্রামীণ ঈদের সেই সহজ-সরল, সম্মিলিত আনন্দের জায়গা দখল করে নিচ্ছে শহুরে বিনোদনের প্রভাব।

স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকা ঈদ

তবু ঈদের মূল সৌন্দর্য এখনো একই জায়গায় মানুষের ভালোবাসা আর মিলনের আনন্দে। প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, ঈদের দিন সকালে নতুন পোশাক পরে নামাজে যাওয়া, পরিবারের সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি করা কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা করার আনন্দ কখনোই মুছে যায় না। এক দশক আগের ঈদ ছিল একটু ধীর, একটু সরল; এখনকার ঈদ দ্রুত আর প্রযুক্তিনির্ভর। তবু উৎসবের মূল সুর একই, খুশি ভাগ করে নেওয়া।

হয়তো আগামী দিনের ঈদ আরও বদলাবে। কিন্তু স্মৃতির অ্যালবামে রয়ে যাবে সেই রঙিন ঈদ কার্ড, জরির পোস্টার আর হাতে লেখা ‘ঈদ মোবারক’ শুভেচ্ছা যেগুলো একসময় গ্রামবাংলার ঈদকে করে তুলেছিল আরও আপন, আরও উষ্ণ।

জেএস/