ধুম ধুম ধুমাধুম—মাদলের গুরুগম্ভীর আওয়াজ বরেন্দ্রের বিস্তীর্ণ আকাশে ছড়িয়ে পড়লো এক অপার্থিব তরঙ্গের মতো। কিন্তু এ শব্দ উৎসবের নয়, এ শব্দ সংকটের। উৎসবের মাদলে থাকে প্রাণের উচ্ছ্বাস, ফসলের গন্ধ, প্রেমের আকুলতা। আর এ মাদলের প্রতিটি আঘাতে জমাট ক্রোধ, প্রতিটি তালে মৃত্তিকার সঙ্গে মানুষের অচ্ছেদ্য সম্পর্কের ঘোষণা। যে সম্পর্ক রক্তে লেখা, ঘামে লেখা, মৃত্যুতে লেখা; কোনো সরকারি স্ট্যাম্পে যা মোছা যায় না।
কী অদ্ভুত এই পাল্টে যাওয়া দুনিয়ার চিত্র।এখন থেকে পনেরো বছর আগে উত্তরবঙ্গের এক প্রান্তিক জেলার প্রায় পরিত্যক্ত সরকারি পতিতভূমি; যেখানে শেয়াল ডাকতো রাতে, ভোরে কুয়াশা জমতো, কিন্তু কোনো ফসল ফলতো না, কোনো পাখি বাসা বাঁধতো না। সেই মৃতপ্রায় মাটিতে ঘর বাঁধতে এসেছিলো সাঁওতাল পরিবারগুলো। কেউ আমন্ত্রণ দেয়নি, কেউ ডাকেনি। বরেন্দ্রের বিষণ্ন প্রান্তে লাঠি হাতে, খালি পায়ে ওরা এসেছিলো বিতাড়িত, নিঃস্ব, তবু অদম্য আর হার না মানা এই কালো পাথুরে দেহের অধিবাসীরা। যে জমি ছিল ইটভাটার ছাই আর ক্রোমিয়াম-বিষের পুকুর, সেই জমিই আজ সবুজে সবুজ। সব পরিশ্রম শেষে লাঙলের ফলায় আর হাতের পেশিতে যা মিলেছে, তা হলো চাষযোগ্য একটা পৃথিবী। সেই পৃথিবী আজ আবার নিঃশব্দে নিঃশেষ হওয়ার পালা!
নক্ষত্র সোরেন বয়সে সাতাশ, কিন্তু চোখে তার এমন একটা স্থির আলো আছে যা সুউচ্চ, বর্ষীয়ান, অভিজ্ঞ আর স্থির পর্বত শিখরেই মানায়। সে আলো অভিজ্ঞতার ভারে মেঘলা নয় বরং সেই আলোর বিকিরণ স্বচ্ছ উচ্চতায় যেখানে বাতাস পাতলা কিন্তু দৃষ্টি সুদূর। ঢাকার একটি কলেজ থেকে ভালো ফলাফল নিয়ে ভূগোলে স্নাতক শেষ করে সে ফিরে এসেছে গ্রামে। সহপাঠীরা অবাক হয়েছিলো এই ভেবে যে, এত কষ্টে ডিগ্রি নিয়ে কী দরকার ছিল সেই ধুলোমাটিতে ফেরার? কিন্তু নক্ষত্রের উত্তর ছিল শান্ত এবং অমোঘ—‘যে মাটিতে বাবার রক্ত মিশেছে, সে মাটি ছেড়ে যাওয়ার নাম পলায়ন। আর আমি পালিয়ে বাঁচার মানুষ নই।’
বাবা হাড়িরাম সোরেন। এই জমি আবাদ করতে গিয়ে কীটনাশকের বিষাক্ত মাটির সঙ্গে এক দশকেরও বেশি লড়াই করেছিলেন তিনি। মাটির বিষ টেনে নিয়েছে তার শরীরের শক্তি, তবু থামেননি। যেদিন প্রথম বোরো ধানের শীষ মাথা তুললো; সেদিন তার মুখের হাসি দেখে মনে হয়েছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ মানুষ এই মাটির কৃষকটি। সেই আনন্দের পরের বছর হৃদরোগে মারা যান হাড়িরাম। নক্ষত্র তখন দ্বাদশ শ্রেণিতে, সবে বুকে পাথর চাপার বয়স। সেই জমিতে চলে এখন সাতচল্লিশ পরিবারের জীবন নির্বাহ।
জেলা প্রশাসনিক ভবন থেকে নোটিশ এসেছে তিন মাস আগে। স্ট্যাম্পে লেখা, ‘সরকারি ঐতিহ্য করিডোর প্রকল্পের অধীনে উক্ত ভূমি অধিগ্রহণ করা হইবে। চল্লিশ দিনের মধ্যে উচ্ছেদ সম্পন্ন করুন।’চল্লিশ দিন। যে মাটিতে পনেরো বছর পরিশ্রম করা হয়েছে, যে মাটিতে পূর্বপুরুষের ঘাম মিশেছে, যে মাটিকে উর্বর করতে একজন পিতা শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছেন; সেই মাটি ছেড়ে যেতে হবে চল্লিশ দিনের নোটিশে!
প্রকল্পটির নাম ‘হেরিটেজ ভ্যালি ট্যুরিজম কর্পোরেশন’। উদ্যোক্তা ড. নয়ন মল্লিক। আইএএস অফিসার, জেলাশাসক। নৃতত্ত্ববিদ্যায় পিএইচডি করা অফিসারটির পাণ্ডিত্য সন্দেহাতীত। যিনি পাল শাসনামলের প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে সেমিনারে বলিষ্ঠ প্রবন্ধ পাঠ করেন এবং বিশ্বাস করেন, সমষপুর গ্রামের টিলার নিচে সুপ্ত আছে হাজার বছরের ঐতিহাসিক সম্পদ। তা থেকে হতে পারে আন্তর্জাতিক আর্কিওলজি কনফারেন্স, হতে পারে নামডাক, পাওয়া যেতে পারে ঢাকায় বদলির যুতসই সুযোগ। সব হিসেব-নিকেষের পর সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জীবন নির্বাহের শেষ সম্বলের প্রশ্নটুকু জড়িয়ে থাকে জমিটির সাথে। সমস্যা হলো, পাণ্ডিত্য সব সময় সংবেদনশীলতা নিয়ে আসে না। সাঁওতালদের ফসল, সে তো নিছক বাধা।
নক্ষত্র সোরেন আদালতে গিয়েছিলো। উকিল পেয়েছিলো সহানুভূতিশীল, কিন্তু কাগজপত্র দুর্বল। জমিটা সরকারি আর দখলে থাকলেও পাট্টা নেই। আইনের চোখে তারা অবৈধ বাসিন্দা। অবৈধ! যারা মরুভূমিতে ফুল ফুটিয়েছে, যারা বিষ মাটিকে শস্যের মাটি বানিয়েছে, তারা অবৈধ। ন্যায়বিচারের এই ফাঁকটা দেখলে মনে হয় আইন একটি ভাষা এবং সেই ভাষায় দুর্বলের কথা বলার বর্ণমালা নেই।
একটিমাত্র মানুষ ছিলেন, যিনি বুঝেছিলেন পুরো বিষয়টা। সুরেশ মাহাতো। অবসরপ্রাপ্ত বনাধিকারিক, একসময়কার ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার। তিনিই প্রথম সাঁওতালদের এই জমিতে বসবাসের অনুমতি দিয়েছিলেন। বেআইনি নয়, মৌখিক সরকারি অনুমোদনে। পনেরো বছর ধরে তিনি এই গ্রামের অভিভাবক। কিন্তু সুরেশ মাহাতো এখন অসুস্থ। বয়স সত্তর পেরিয়েছে। তার চিঠি ড. মল্লিকের দপ্তরে পৌঁছেছিলো। ফাইলচাপা পড়েছে। ফোনে ড. মল্লিক মার্জিত ভাষায় বলেছেন, ‘আপনার আবেগটা বুঝতে পারছি, কিন্তু ঐতিহাসিক দায়িত্বের কাছে ব্যক্তিগত সংবেদনশীলতা খাটো হয়ে যায় স্যার।’সুরেশ মাহাতো ফোন রেখে বহুক্ষণ চুপ করে বসে ছিলেন। ভাবছিলেন, মৃতের কঙ্কাল উদ্ধার করতে জীবন্ত মানুষকে কবর দেওয়ার তোড়জোড়! এ কেমন ঐতিহাসিকতার ধর্ম, যার বেদিতে জীবন বলিদান হয়?
ধুম ধুম ধুমাধুম—মাদল বাজছে। বাজছে কারণ ক্যাটারপিলার এক্সক্যাভেটরটা সীমানা পেরোনোর চেষ্টা করছে। গ্রামের মানুষ ক্যাটারপিলার এক্সক্যাভেটরটার নাম দিয়েছে ‘কালপুরুষ’। মহাকালের রূপক, সর্বগ্রাসী সময়ের প্রতীক। বিশাল হলুদ শরীর, লোহার হাত প্রসারিত আকাশের দিকে, শুঁড়ের মতো ঝুলে আছে বালতি-আকৃতির খাঁচা। গর্জনে মাটি কাঁপে। কালো ধোঁয়া আকাশে ফুঁড়ে উঠে মেঘের সঙ্গে মিশে যায়; যেন পৃথিবীরই একটা দীর্ঘশ্বাস।
কালপুরুষের চালকের নাম বিরসা মুণ্ডা।মহাশ্বেতা দেবীর ‘অরণ্যের অধিকার’ উপন্যাসের সেই কিংবদন্তি বিদ্রোহীর নামই। যেন ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর পরিহাস! এক বিরসা একদিন জঙ্গলের অধিকারের জন্য লড়েছিলো, আরেক বিরসা আজ সেই জঙ্গলের সন্তানদের মাটি গ্রাস করতে যন্ত্রের হাতল ধরে বসে আছে। সাঁওতাল নয়, মুণ্ডা গ্রাম থেকে আসা এই যুবক তিন মাস ধরে ঠিকাদারের অধীনে কাজ করছে। মাসে পাঁচ হাজার টাকা মাইনে। মা অসুস্থ, বাবা নেই, ছোট ভাই স্কুলে পড়ে। কালপুরুষের চালকের আসনে বসা বিরসার মুখ আজ পাথরের মতো শক্ত। কিন্তু পাথরের ভেতরেও ফাটল থাকে আর সেখান থেকেই একদিন জন্ম নেয় ঘাস, ফার্ন, ফুল। বিরসার মনের ভেতরে কী চলছে তা সে নিজেও জানে না।
আরও পড়ুননাহিদ হোসাইনের অনুগল্প: মেঘলার একুশড. নয়ন মল্লিক দাঁড়িয়ে আছেন তার সাদা টয়োটা ফর্চুনারের পাশে। রোদ থেকে বাঁচতে সানগ্লাস, হাতে স্মার্টফোন। পেছনে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের একটি দল। তাকে দেখলে মনে হয়, একটি ঐতিহাসিক সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। কিন্তু নিজেই জানেন না যে, তিনি সেই সত্যের প্রতিষ্ঠাতা নন, প্রতিদ্বন্দ্বী। নক্ষত্র সোরেন দাঁড়িয়ে আছে মাঠের মাঝখানে। তার পেছনে সাতচল্লিশটি পরিবার; বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, মেয়ে-পুরুষ, শিশু। হাতে ধানের শীষ। মাঠভরা পাকা বোরো ধান। পরশু কাটার কথা ছিল। নক্ষত্রের হাতে নেই তীর-ধনুক। আছে একটি মুঠোফোন, একটি মাইক্রোফোন আর একটি হাতে লেখা প্ল্যাকার্ড—‘বন যতদূর ঠিক ততদূর আমার বাড়ি।’
ড. মল্লিক মাইক্রোফোনে ঘোষণা করলেন, ‘আপনারা সরকারি আদেশ মানছেন না। এটি আইন অমান্য। যন্ত্রকে কাজ করতে দিন।’ নক্ষত্র মাইক্রোফোনে ধীর কিন্তু দৃঢ়কণ্ঠে বললো, ‘এই জমিতে আমার বাবার রক্ত মিশেছে। এই ধানে আমার মায়ের ঘাম। পাল রাজারা কোনো ইতিহাস রেখে গিয়ে থাকলে সে ইতিহাস আমাদের কবর দিয়ে পড়তে হবে না। ইতিহাস কখনো জীবিতের শত্রু নয়। যে ইতিহাস জীবনকে হত্যা করে, সেটা ইতিহাস নয়, সে হলো রাজনীতি।’
ড. মল্লিক ইশারা করলেন। বিরসার হাত ধরে কালপুরুষ এগোল। মেশিনটা মাঠে ঢুকলো। চাকার তলায় পাকা ধানের শীষ মড়মড় করে ভাঙতে লাগলো। সোনালি শীষ কাদায় নিঃশব্দে নিঃশেষ হলো। নক্ষত্র পিছু হটলো না। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো অন্ধকারে একলা জ্বলা নক্ষত্রের মতোই। যে নেভে না, সরে না, কেবল অস্তিত্বের জানান দেয় প্রজ্জ্বলিত আলোকবিন্দুতে।
পাহাড়পুরের বিহার যদি সত্যিই এই টিলার নিচে থাকে, তার পাথরে কি লেখা আছে এই অশ্রুর কথা? এই সোনালি ধানের কথা? পাল রাজারা কি জানতেন, একদিন তাদের নামে এই মাটিতে এই অন্যায় হবে?মাদল বাজছে। নক্ষত্রের মা টিলার ওপরে দাঁড়িয়ে মাদল বাজাচ্ছেন। অন্য মেয়েরাও। নাগাড়া বাজছে। টিকারা বাজছে। সাঁওতালি বাদ্যের সম্মিলিত আওয়াজ আকাশে ধ্বনিত হলো—কোনো বিলাপ নয় বরং যেন বিদ্রোহ ঘোষণার জ্বলন্ত সুর!
হঠাৎ বিরসার হাত কাঁপলো। যন্ত্রের চাকার নিচে একটি শিশু। না, সরে গেছে মুহূর্তে! কিন্তু যে ভয়টা বিরসার বুকে ঢুকেছে সেটা আর বেরোল না। সে যন্ত্র থামালো। ড. মল্লিক চিৎকার করলেন, ‘কী করছো? চালাও! চালাও!’বিরসা ক্যাবিন থেকে নামলো। নিচে দাঁড়িয়ে সে নক্ষত্রের মুখের দিকে তাকালো। দুজন একই মাটির মানুষ। একজন হলুদ মেশিনের দাস, একজন হলুদ ধানের প্রহরী। একজনের হাতে পাঁচ টাকার দায়, অন্যজনের হাতে পনেরো বছরের ইতিহাস।‘পারবো না।’ বিরসা নয়ন মল্লিকের চোখে চোখ রেখে উচ্চারণ করলো—স্পষ্ট, শান্ত, অটল।তারপর হাঁটতে লাগলো উল্টোদিকে। পেছনে তাকালো না। পেছনে তাকানোর দরকার ছিল না। কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পেছনে ফেরার আর জায়গা থাকে না।
ড. মল্লিক ক্রোধে উন্মত্ত। অন্য অপারেটর কোথা থেকে আনা হবে! তিনি ফোনে কথা বলতে বলতে হাঁটছেন, ফর্চুনারের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালেন। এবং তখনই—কালপুরুষ যেন নিজেই কথা বললো। বিরসা ব্রেক লক না করেই নেমেছিলো। ইঞ্জিন চলছিলো। মাটি ঢালু আর ভেজা। সদ্য বৃষ্টির পরের পিচ্ছিল মাটি। সেই ঢালে কালপুরুষের বিশাল লৌহ শরীর আস্তে আস্তে সরতে লাগলো পেছন দিকে; অতিকায় জড়তায়, অনিবার্যভাবে, যেন পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণও আজ সত্যের পক্ষ নিয়েছে। চালকবিহীন ক্যাটারপিলার তার নিজস্ব ভারে পিছলালো। গর্জন বাড়লো। মাটি কাঁপলো।‘গাড়ি! গাড়ি সরাও!’—কেউ চিৎকার করলো।কিন্তু ড. মল্লিক ফোনে কথা বলতে বলতে খেয়াল করেননি। বুঝলেন তখন; যখন কালপুরুষের লোহার শরীর এসে স্পর্শ করেছে সাদা ফর্চুনারকে। ধাতুর ওপর ধাতুর চাপ; প্রথমে ক্যাঁচক্যাঁচ, তারপর বিস্ফোরণের মতো শব্দ।
ফর্চুনার চুরমার!ধুলো থিতু হলে দেখা গেলো কালপুরুষ পড়ে আছে খাদে। তার হলুদ শরীরে আঁচড়। ফর্চুনারের সাদা পাঁজর গুঁড়িয়ে গেছে, ছড়িয়ে পড়েছে ভাঙা কাচ, বাঁকা লোহা। ড. নয়ন মল্লিক নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছেন। শরীর অক্ষত কিন্তু মুখে রক্ত নেই। সেই মুহূর্তে তাকে দেখে মনে হচ্ছিলো যেন তিনি একটি নিরেট তত্ত্ব, বাস্তবের সামনে পড়ে হঠাৎ আবিষ্কার করেছে তার ফাঁকফোকর।
নক্ষত্র সোরেন এগিয়ে গেল।পাকা ধানের ক্ষেতের ওপর দিয়ে কালপুরুষের মাড়িয়ে যাওয়া অংশে নষ্ট ফসলে পা রেখে দিয়ে সে এগিয়ে গেল সোজা। মাদলের শব্দ বন্ধ হয়ে গেছে। চারদিকে এক অপার্থিব নীরবতা। যে নীরবতায় অনেক কিছু বলা হয়ে যায়।নক্ষত্র নয়ন মল্লিকের সামনে দাঁড়ালো। বললো, ‘আপনি পাল রাজাদের ইতিহাস খুঁজছেন। আমি আপনাকে বলছি, পাল রাজারা এই মাটিতেই রাজত্ব করেছিলেন। কারণ এই মাটির মানুষেরা তাদের শক্তি ছিল। তাদের ভাস্কর্য, তাদের বিহার, তাদের শিলালিপি, সব কিছুর ভিত্তিতে ছিল কৃষকের ফসল, কুমোরের মাটি, শিল্পীর তুলি, তাঁতির সুতো। সেই মানুষদের উত্তরসূরিকে তাড়িয়ে পাথরের টুকরো তুলবেন? এটা ইতিহাসচর্চা নয় বরং এটা ইতিহাসের অপমান। ধর্মপাল থেকে দেবপাল—কোনো পাল রাজাই প্রজার রক্তে রাজকীয় হননি। সেটা আপনার চেয়ে আমি ভালো জানি।’
ড. মল্লিক কিছু বললেন না। তার মুখে সেই ভাষা ছিল না। নিরাপত্তা পুলিশ এগিয়ে এলো। নক্ষত্রকে হাতকড়া পরানো হলো। সেই রাতে জেলা সদরের থানায় বসে নক্ষত্র ভাবছিলো কালপুরুষ আর নেই। ফর্চুনারও নেই। ফসলের একটা অংশ নষ্ট হয়েছে। সে নিজে বন্দি। তবু যা অবশিষ্ট রইলো, সাতচল্লিশটি পরিবারের মেরুদণ্ড। সব হারিয়েও ওই আনন্দটুকু সম্বল করে একটু হাসলো সে। মায়েরা মাদল বাজিয়েছে। তরুণরা পিছু হটেনি। বিরসা নেমে গেছে মেশিন ছেড়ে। এটুকুই।এটুকু কম নয়। নিজের হাতকড়া পরা হাতের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। বাইরে কোথাও রাতের পাখি ডাকছিলো।
আরও পড়ুনঅনুগল্প: ভ্রমণপরদিন ভোরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও ছড়িয়ে পড়লো দাবানলের মতো।বিরসা মুণ্ডার সাক্ষাৎকার—‘আমি পারিনি। ওদের চোখের দিকে তাকিয়ে পারিনি।’ নক্ষত্রের প্ল্যাকার্ডের ছবি, উপড়ে যাওয়া ধানের শীষ আর মেশিনের ধ্বংসস্তূপের পাশাপাশি ফ্রেম। শহর থেকে পাহাড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে আদিবাসী গ্রামে ছবিটা ছড়িয়ে গেল। মানবাধিকার সংগঠন বিবৃতি দিলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা স্বাক্ষর সংগ্রহ করলেন। প্রত্নতত্ত্ববিদরা সংবাদমাধ্যমে বললেন, ‘টিলার নিচে যাই থাকুক, জীবন্ত মানুষকে সরিয়ে প্রত্নতত্ত্ব উদ্ধার করা নৈতিক নয়।’আদালত স্থগিতাদেশ দিলো এক সপ্তাহ পরে।
ড. নয়ন মল্লিকের বদলি হলো। নক্ষত্র সোরেন জামিনে মুক্ত পেলো। সুরেশ মাহাতো হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে খবর পেলেন। বললেন, ‘জানতাম। জীবন্ত মাটি মরে না।’
সমষপুর গ্রামের টিলা আজও দাঁড়িয়ে। তার গায়ে সদ্য জন্মানো সবুজ ঘাসের সমারোহ। বৃষ্টির পর যে ঘাস জেগে ওঠে। তারা কি জানে না, কে ডেকেছে ওদের! কে অনুমতি দিয়েছে! ওরা কেবল জেগে ওঠে মাটির বুক থেকে। কারণ মাটি বলেছে, জাগো!
এই মাটির নিচে কী আছে! পাথরের শিলালিপি, নাকি সভ্যতার ঘুম—এসব হয়তো একদিন জানা যাবে। কিন্তু টিলার ওপরে যা আছে তা এখনই জানা যায়; সাতচল্লিশটি পরিবার, তাদের ফসল, তাদের গান, তাদের সন্তান, তাদের মৃত পিতার স্মৃতি। এও তো ইতিহাস। এটাও তো ঐতিহ্য। হয়তো আরও কিছু বেশি।
মাদল বাজছে। আবারও মাদল বাজছে। কারণ ফসল কাটার উৎসব শুরু হয়েছে। এবার মাদলে উৎসব আছে। ফসলের গন্ধ আছে। প্রেমের আকুলতা আছে। এবার মাদল বাজছে, কারণ মানুষ বেঁচে আছে।
এসইউ