ফিচার

যে কর্মসূচি বদলে দিলো দেশের স্বাস্থ্যচিত্র

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সফলতার গল্প বলতে গেলে সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণগুলোর একটি হলো ইমিউনাইজেশনের সম্প্রসারিত কর্মসূচি ‘ইপিআই’। স্বাধীনতার পর নানা সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে যাত্রা শুরু করা এই কর্মসূচি আজ দেশের জনস্বাস্থ্যের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল, পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে মাত্র চারটি বিভাগে আটটি থানায় ইপিআই চালু করা হয়। শুরুতে এর আওতায় ছিল ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ টিকা বিসিজি, ডিপিটি, ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন (ওপিভি), টিটেনাস (টিটি) এবং হাম প্রতিরোধী টিকা। কিন্তু সেই সময় টিকাদান কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল খুবই সীমিত, এবং বেশিরভাগই শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে সেবা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ১৯৮৪ সালের মধ্যে টিকাদান কভারেজ ছিল মাত্র ২ শতাংশেরও কম।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকার বৈশ্বিক ‘ইউনিভার্সাল চাইল্ড ইমিউনাইজেশন’ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়। এরপর ধাপে ধাপে ইপিআই কার্যক্রমকে শক্তিশালী করা হয়। ১৯৮৫-১৯৯০ সালের মধ্যে দেশের ৪৭৬টি উপজেলা, ৯২টি পৌরসভা এবং ৬টি সিটি করপোরেশনে টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়। এর ফলে ১৯৯০ সালের মধ্যে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের জন্য সারাদেশে টিকাদান সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

আরও পড়ুন: ফুসফুসে নয়, হাড়-মস্তিষ্ক-কিডনিতেও হতে পারে যক্ষ্মা যক্ষ্মা নিয়ে সচেতনতা জরুরি, অবহেলা নয়

পরবর্তী তিন দশকে বাংলাদেশ টিকা-প্রতিরোধযোগ্য রোগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। নিয়মিত টিকাদানের উচ্চ হার বজায় রাখার পাশাপাশি নতুন নতুন ভ্যাকসিন যুক্ত হয়েছে জাতীয় কর্মসূচিতে। ২০০৩ সালে হেপাটাইটিস বি, ২০০৯ সালে হিব (হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি), ২০১২ সালে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার দ্বিতীয় ডোজ এবং ২০১৪ সালে নিউমোকক্কাল কনজুগেট ভ্যাকসিন (পিসিভি) চালু করা হয়। পরবর্তীতে নিষ্ক্রিয় পোলিও ভ্যাকসিন (আইপিভি), রুবেলা প্রতিরোধ, এবং অন্যান্য আধুনিক টিকাও যুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশের এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলে বেশ কিছু বড় অর্জন এসেছে। ২০০৬ সালের পর দেশে আর কোনো বন্য পোলিও ভাইরাস শনাক্ত হয়নি এবং ২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে পোলিওমুক্ত ঘোষণা করে। ২০০৮ সালে মাতৃ ও নবজাতক টিটেনাস নির্মূল হয়। একইভাবে রুবেলা নিয়ন্ত্রণেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে এবং হাম নিয়ন্ত্রণে নজরদারি ব্যবস্থাও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেছে।

ছবি: সাবেক স্বাস্থ্য সচিব মো. সাইদুর রহমান

এ বিষয়ে সাবেক স্বাস্থ্য সচিব মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে বড় অর্জনের মধ্যে ইপিআই একটি বড় অর্জন। ইপিআই হলো সরকারের একটি অন্যতম প্রধান জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি, যার মাধ্যমে শিশুদের সংক্রামক ও প্রাণঘাতী ১০টি রোগ থেকে রক্ষায় বিনামূল্যে টিকা দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সালে চালু হওয়া এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো যক্ষ্মা, পোলিও, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি, নিউমোনিয়া, হাম ও রুবেলার মতো মারাত্মক রোগের বিরুদ্ধে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

টিকাদান কর্মসূচি, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা এসব ক্ষেত্রে আমরা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। কম খরচে বড় জনগোষ্ঠীকে সেবা দেওয়ার সক্ষমতাও আমাদের একটি শক্তি। এছাড়া গড় আয়ু বৃদ্ধিতেও আমাদের ভালো অর্জন রয়েছে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ টিকাদান কর্মসূচিকে আরও আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার দিকে জোর দিয়েছে। দুর্গম এলাকা, শহরের বস্তি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর শিশুদের আওতায় আনতে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন, মোবাইল ট্র্যাকিং এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে টিকাদান কার্যক্রম আরও কার্যকর করা হচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময়েও বাংলাদেশ দ্রুত ভ্যাকসিন প্রদান করে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।

বর্তমানে সরকার রোটাভাইরাস, এইচপিভি (মানব প্যাপিলোমাভাইরাস) টিকা এবং অন্যান্য নতুন ভ্যাকসিন জাতীয় কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। একই সঙ্গে হাম ও রুবেলা সম্পূর্ণ নির্মূল, পোলিওমুক্ত অবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ডিপথেরিয়া, টাইফয়েড ও কলেরার মতো রোগ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে ইপিআই শুধু একটি স্বাস্থ্য কর্মসূচি নয়, এটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের এক অনন্য সাফল্যের প্রতীক। সীমিত সম্পদ, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা এবং জনসংখ্যার চাপের মধ্যেও যে একটি দেশ পরিকল্পনা, প্রতিশ্রুতি এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বমানের সাফল্য অর্জন করতে পারে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ আজকের বাংলাদেশ।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন

জেএস/