ফুসফুসে নয়, হাড়-মস্তিষ্ক-কিডনিতেও হতে পারে যক্ষ্মা
যক্ষ্মা বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে দীর্ঘদিনের কাশি, জ্বর আর দুর্বলতা। অর্থাৎ ফুসফুসের একটি রোগ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যক্ষ্মা শুধু ফুসফুসেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও আক্রমণ করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব যক্ষ্মা ধরা পড়ে দেরিতে, কারণ লক্ষণগুলো পরিচিত নয় বা ভিন্ন ধরনের।
এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন মুন্সীগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. সাঈদ হোসেন। তার মতে, ‘যক্ষ্মা একটি সংক্রামক রোগ হলেও এর প্রভাব শুধু শ্বাসতন্ত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। হাড়, মস্তিষ্ক, কিডনি, লিম্ফ নোড এমনকি ত্বকেও এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।’
ছবি: ডা. মো. সাঈদ হোসেন
যক্ষ্মা কী এবং কীভাবে ছড়ায়?
যক্ষ্মা মূলত মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস নামের ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। সংক্রমিত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে বাতাসের মাধ্যমে এই জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্য কেউ তা শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করলে সংক্রমিত হতে পারে। প্রাথমিকভাবে এই জীবাণু ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটালেও, সময়মতো চিকিৎসা না হলে বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে এটি রক্ত বা লিম্ফের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তখন সেটিকে বলা হয় এক্সট্রা-পালমোনারি টিবি (ফুসফুসের বাইরের যক্ষ্মা)।
হাড়ে যক্ষ্মা
হাড়ের যক্ষ্মা সাধারণত মেরুদণ্ডে বেশি দেখা যায়, যাকে ‘স্পাইনাল টিবি’ বলা হয়। লক্ষণগুলো হতে পারে-দীর্ঘদিনের কোমর বা পিঠের ব্যথা, চলাফেরায় অসুবিধা, শরীর বাঁকা হয়ে যাওয়া (কিছু ক্ষেত্রে), জ্বর ও ওজন কমে যাওয়া। ডা. সাঈদ হোসেন জানান, ‘অনেক সময় রোগীরা এটিকে সাধারণ ব্যথা ভেবে অবহেলা করেন। ফলে রোগ জটিল হয়ে পড়ে।’
মস্তিষ্কে যক্ষ্মা
মস্তিষ্কে যক্ষ্মা হলে সেটিকে টিবি মেনিনজাইটিস বলা হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সম্ভাব্য লক্ষণ- তীব্র মাথাব্যথা, বমি বা বমি ভাব, জ্বর, খিঁচুনি, অচেতন হয়ে পড়া। এই ধরনের যক্ষ্মা দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা না করলে জীবনহানির ঝুঁকি থাকে।
কিডনিতে যক্ষ্মা
কিডনিতে যক্ষ্মা তুলনামূলকভাবে নীরবে ক্ষতি করে, অনেক সময় রোগী বুঝতেই পারেন না। লক্ষণগুলো হলো- প্রস্রাবে জ্বালা বা ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত, ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রবণতা, হালকা জ্বর। ডা. সাঈদ হোসেন বলেন, অনেকেই এটিকে ইউরিন ইনফেকশন ভেবে ভুল করেন, ফলে সঠিক চিকিৎসা পেতে দেরি হয়।
লিম্ফ নোড ও অন্যান্য অঙ্গে যক্ষ্মা
ফুসফুসের বাইরের যক্ষ্মার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় লিম্ফ নোড টিবি। এতে গলায় বা বগলে গাঁট দেখা যায়, যা ধীরে ধীরে বড় হয়। এছাড়া ত্বকে ক্ষত, অন্ত্রে সমস্যা, জেনিটাল অঙ্গে সংক্রমণ। এমন নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
আরও পড়ুন:
- যক্ষ্মা নিয়ে সচেতনতা জরুরি, অবহেলা নয়
- ১৫-২০ দিন ধরে কাশি থামছে না? জানুন সহজ সমাধান
- ঈদ প্রস্তুতিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় চিকিৎসকের বিশেষ পরামর্শ
কেন দেরিতে ধরা পড়ে?
এক্সট্রা-পালমোনারি যক্ষ্মা সাধারণত ধীরে ধীরে লক্ষণ প্রকাশ করে এবং তা অনেক সময় অন্য রোগের সঙ্গে মিলে যায়। ফলে রোগীরা প্রথমে গুরুত্ব দেন না বা ভুল চিকিৎসা নেন। ডা. সাঈদ হোসেনের ভাষায়, যক্ষ্মার এই ধরনগুলো চিহ্নিত করা কঠিন। তাই দীর্ঘদিন কোনো অজানা সমস্যা থাকলে পরীক্ষা করানো জরুরি।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
- যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম
- ডায়াবেটিস রোগী
- অপুষ্টিতে ভোগা মানুষ
- দীর্ঘদিন স্টেরয়েড গ্রহণকারী
- ধূমপায়ী
- এছাড়া শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বেশি থাকে
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
যক্ষ্মা সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য রোগ, যদি সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নেওয়া যায়। সাধারণত ৬ মাস বা তার বেশি সময় ধরে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো-
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ নিয়মিত খেতে হবে
- মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করা যাবে না
- পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে হবে
- বিশ্রাম ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে
সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে যক্ষ্মার চিকিৎসা ও ওষুধ পাওয়া যায়, যা রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সচেতনতা জরুরি
যক্ষ্মা নিয়ে এখনো সমাজে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, এটি শুধু কাশির রোগ বা শুধু ফুসফুসেই হয়। এই ভুল ধারণার কারণে অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা নেন না। ডা. সাঈদ হোসেন বলেন, যক্ষ্মা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে এবং লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করালে এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব।
যক্ষ্মা শুধু ফুসফুসের রোগ নয়; এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে নানাভাবে ক্ষতি করতে পারে। তাই দীর্ঘদিন কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। নিজের সচেতনতা, সময়মতো পরীক্ষা এবং নিয়মিত চিকিৎসাই পারে যক্ষ্মাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে। মনে রাখবেন, যক্ষ্মা লুকিয়ে রাখার মতো কোনো রোগ নয়, সঠিক তথ্যই পারে আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে নিরাপদ রাখতে।
জেএস/


