আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার চেষ্টা সফল হবে কি?

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার পরিবেশ তৈরির জন্য পাকিস্তান যখন তার সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, ঠিক তখনই পাল্টাপাল্টি সামরিক অবস্থানে সেই উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ইরানে ইসরায়েলের অব্যাহত বিমান হামলা এবং পারস্য উপসাগরে মার্কিন সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি ইসলামাবাদের ‘শান্তি রক্ষকের’ ভূমিকাকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ইসলামাবাদের ‘হাই-ওয়্যার ডিপ্লোম্যাসি’

মধ্যপ্রাচ্যের সরাসরি কোনো পক্ষ না হওয়া এবং কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি না থাকায় পাকিস্তান নিজেকে একটি নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে উপস্থাপন করছে। পাকিস্তানের ডি-ফ্যাক্টো নেতা ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনীর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছেন, অন্যদিকে গত দুই বছরে তেহরানের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কের নাটকীয় উন্নতি হয়েছে।

আরও পড়ুন>>যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালালে ফলাফল কী হবে, ঝুঁকি কতটা?গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ/ ইরান যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেবে হুথিদের অংশগ্রহণ?ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন/ ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের সামনে কঠিন ৪ পথ, নেই সহজ সমাধান

পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, দুই পক্ষই নীতিগতভাবে আলোচনায় বসতে রাজি। তবে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পারস্পরিক আস্থার অভাব এবং ইসরায়েলের বাধা দানকারীর ভূমিকা, যা পুরো প্রক্রিয়াকে ভেস্তে দিতে পারে।

আলোচনা শুরুর আগে নতুন হামলা

গত শুক্রবার ইরানের দুটি বৃহৎ ইস্পাত কারখানা, দুটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কূটনীতিকে সুযোগ দিতে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা বন্ধের যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, এই আক্রমণ তার সম্পূর্ণ বিপরীত।’

পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধি বলেন, ‘ইরানের প্রধান উদ্বেগ হলো যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি এবং ভবিষ্যতে আর কোনো মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা হবে না, তার নিশ্চয়তা পাওয়া। কিন্তু ট্রাম্পের খেয়ালি আচরণের ওপর ভরসা করা তেহরানের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

শর্তের লড়াই: হরমুজ প্রণালি ও নিরাপত্তা

আলোচনার টেবিলে সবচেয়ে বড় বিরোধের বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি। ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই জলপথের যৌথ প্রশাসনের একটি প্রস্তাব দিয়েছেন।

এখন পর্যন্ত পাকিস্তান দুই পক্ষের মধ্যে প্রস্তাব আদান-প্রদান করছে, যদিও উভয় পক্ষই কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তবুও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা মনে করেন, আন্তরিকতা থাকলে সমাধান সম্ভব।

মুসলিম বিশ্বের নতুন মেরুকরণ

শান্তি প্রচেষ্টাকে বেগবান করতে ইসলামাবাদে তুরস্ক, মিশর, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই চারটি দেশ একটি নতুন জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে, যাদের হাতে রয়েছে বিশাল সেনাবাহিনী, পারমাণবিক অস্ত্র এবং সৌদি আরবের আর্থিক শক্তি।

তবে পর্দার আড়ালে অস্বস্তিও রয়েছে। বারবার ইরানি হামলার শিকার হওয়া সৌদি আরবের কিছু কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে ইরানের ওপর বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতি বলে জানা গেছে।

আলোচনায় ফল মিলবে?

পাকিস্তান আশা করছে, আলোচনাগুলো সরাসরি না হয়ে পরোক্ষভাবে হবে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসতে রাজি নয়।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা পাঠানোর কথা ভাবছে। এরই মধ্যে প্রায় সাত হাজার সেনা পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে, এর সঙ্গে আরও ১০ হাজার সেনা যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে সামরিক প্রস্তুতি বাড়তে থাকায় অনেকেই মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য শান্তি আলোচনা নয়।

বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে পাকিস্তান। ইরান স্টিভ উইটকফ বা জ্যারেড কুশনারের চেয়ে ভ্যান্সের ওপর বেশি ভরসা রাখছে, কারণ তিনি এই যুদ্ধের ব্যাপারে কিছুটা সংশয়ী। ভ্যান্স সম্প্রতি এক পডকাস্টে বলেছেন, মার্কিন সামরিক লক্ষ্যগুলোর অধিকাংশই অর্জিত হয়েছে, তবে প্রস্থান করার আগে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান তারা।

পাকিস্তানের স্বার্থ কী?

ইসলামাবাদের জন্য এই মধ্যস্থতা কেবল আঞ্চলিক শান্তি নয়, বরং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইও বটে। সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়লে পাকিস্তান অনিচ্ছাসত্ত্বেও রিয়াদের পক্ষে যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য হতে পারে।

ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে পাকিস্তান যে কোনো মূল্যে এই সংঘাত এড়াতে চায়। তবে যুদ্ধ বাড়তে থাকলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কেবলই বাড়ছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ানকেএএ/