যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালালে ফলাফল কী হবে, ঝুঁকি কতটা?
ইরান যুদ্ধের এক মাসের মাথায় বিশ্বজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র কি এবার ইরানে সরাসরি স্থল অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে? একদিকে আলোচনার বার্তা, অন্যদিকে পারস্য উপসাগরে হাজার হাজার মার্কিন সেনার সমাবেশ এক ভয়াবহ সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অভিযান শুরু হলে তা কেবল ইরানের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে।
আলোচনায় স্থল অভিযান
ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সম্প্রতি এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছেন, ‘শত্রুরা জনসমক্ষে আলোচনার কথা বললেও গোপনে স্থল অভিযানের নীল নকশা আঁকছে।’
তার এই আশঙ্কা অমূলক নয়। গত সপ্তাহান্তেই এশিয়া থেকে সাড়ে তিন হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে।
সম্ভাব্য লক্ষ্য কোথায়?
ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন বাহিনীর মূল লক্ষ্য হতে পারে ইরানের প্রধান তেল টার্মিনাল খার্গ দ্বীপ দখল করা। এটি করতে পারলে ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া এবং শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) অর্থায়ন বন্ধ করা সম্ভব হবে।
এছাড়া কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ফের চালু করাও মার্কিন পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। এই জলপথ দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানির একটি বড় অংশ পরিবহন হয়, যা বর্তমানে কার্যত বন্ধ রয়েছে।
আরেকটি আলোচিত লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো। বিশেষ করে নাতাঞ্জ, ফোর্দো ও ইসফাহানের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অভিযান চালিয়ে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করার কথাও বলা হচ্ছে।
কেমন হতে পারে অভিযান?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরাকে ২০০৩ সালের মতো বড় আকারের অভিযান নয়, বরং ছোট ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান হতে পারে।
অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কাতারের এএফজি কলেজের অধ্যাপক টমাস বনি জেমস বলেন, ‘এ ধরনের অভিযান হবে সীমিত, দ্রুত এবং অত্যন্ত নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক।’ এতে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত মোতায়েনযোগ্য বাহিনী, যেমন ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন ব্যবহার করা হতে পারে।
এই কৌশলে প্রথমে আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরানের প্রতিরক্ষা দুর্বল করা হবে। এরপর বিশেষ বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রবেশ করে অভিযান চালাবে। পুরো প্রক্রিয়ায় গতি ও নির্ভুলতার ওপর জোর দেওয়া হবে এবং দ্রুত বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হবে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান চালালে ইরানের প্রতিক্রিয়া হবে কঠোর। ইরান এরই মধ্যে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
এ ধরনের হামলা আরও বাড়তে পারে, পাশাপাশি ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো—যেমন লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথিরাও সক্রিয় হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এমনকি ছোট পরিসরের অভিযানও বড় আকারের সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
ঝুঁকি কতটা বড়?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানে স্থল অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দেশটি ভৌগোলিকভাবে বিশাল এবং পাহাড়ি হওয়ায় যুদ্ধ কঠিন হবে।
তাছাড়া, দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাব্য হামলার ইঙ্গিত থাকায় ইরান প্রস্তুত রয়েছে। গালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, ইরানি বাহিনী অপেক্ষা করছে—মার্কিন সেনারা ঢুকলেই তারা হামলা চালাবে।
এতে দ্রুতই পরিস্থিতি ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাতে পরিণত হতে পারে।
আঞ্চলিক প্রভাব
এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উপসাগরীয় দেশগুলো এখনই ভয়াবহ অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ইরান সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধ বাড়লে তারা আঞ্চলিক জ্বালানি স্থাপনায় হামলা জোরদার করবে। এরই মধ্যে কাতারের রাস লাফান গ্যাস স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন হামলা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য স্থল অভিযান শুধু একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়—এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।