সাহিত্য

ছোটগল্প: কবিতা বাড়ি

শহরের একপ্রান্তে বাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল; ঠিক যেমন তার মালিক—ভেতরে শক্ত, বাইরে জীর্ণশীর্ণ। চুন খসা, দেওয়ালে শ্যাওলা, দরজার পাল্লায় ঘুণে ধরা দাগ—হাশেম মজুমদার সেগুলো আমলে নিতেন না। ভাড়াটিয়া আবার মানুষ নাকি?

বাড়ির একমাত্র ভাড়াটে লালন খান। কবি। বয়স চব্বিশ বা পঁচিশ। টাকার জন্য মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। মাথার ভেতর গিজগিজ করে শব্দের ঝড়। সে কবিতা লিখে খায় না—কবিতা তাকে বাঁচিয়ে রাখে। দুপুরে কিংবা সন্ধ্যাবেলা উঠোনে বসে সে যখন লালনের গান কিংবা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা জীবনানন্দ পড়ে, মনে হয় শব্দগুলোই তার ঠিকানায় ফিরে এসেছে। আজ সে লিখলো—‌‘পড়েছি ঝেপে অন্ধকূপেসুড়ংয়ের মাথায় আলো;বন্ধুর পথ সুদূরের রথমনের আলো জ্বালো।’

কাঠখোট্টা হাশেমের জীবনে একমাত্র কোমল নাম—তার একবিংশী কন্যা মৌসুমী। স্থানীয় কলেজে পড়ে। তার চোখে প্রদীপ্ত সূর্যের আলো, সুকণ্ঠী। কলা বিভাগের ছাত্রী তবুও সে লালনের কবিতা বোঝে না, কিন্তু কবিতার মানুষটাকে বুঝে ফেলেছে সহজেই। মাঝে মাঝে তরকারির বাটি চালাচালি, কফি বানিয়ে দেওয়া। চিনি-গুড় ধার দেওয়া-নেওয়া ইত্যাদি চলছে। সেদিন সে লিখেছিলো—‘কচকচে কালো টাকারসে কী উত্তাপ;ওরে বাপরে বাপ!যেন শত সূর্যের চেয়েদুর্জনেরই বেশি তাপ!

মাঝে মাঝে মনে হয়সততা সরলতা বোকামিসৎ থাকাই কি তবে পাপ?’

একদিন বিকেলে একতলা বাড়ির ছাদে ধূমায়িত চায়ে চুমুক দিতে দিতে মৌসুমী জিজ্ঞেস করল—: আচ্ছা লালন ভাই, কবিতা লেখেন কেন?: কিছু অনুভূতি কথা হয়ে আসে না, কবিতা হয়ে আসে। তাই লিখি।মৌসুমী মাথা নেড়ে বলে, ‘বুঝতে পারিনি, একটু বুঝিয়ে বলুন।’তখন লালন চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে মৃদু হেসে বলল—: ধরো, হঠাৎ মন খারাপ হলো। কাউকে বলা গেল না, কাঁদাও গেল না। সেই না-বলা, না-কান্নাটাকেই আমি কবিতায় লিখে রাখি—যাতে মনটা হালকা হয়।: আর যদি সুখের বিষয় হয়?: সুখ আরও ক্ষণস্থায়ী। হাসিটা মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আমি কবিতার ফ্রেমে বেঁধে রাখি—যেন পরে আবার ছুঁয়ে দেখতে পারি; সুখের ছোঁয়া।

হাশেম দূর থেকে দেখলো ওরা হাসাহাসি করছে। মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল। চাল-চুলো নেই কবি মানুষে তার বিশ্বাস ছিল না। আবার তিন মাসের ভাড়া বাকি। এদিকে মাংসের দাম বেড়ে যাওয়ায় তার কসাইখানায় কাজ কমে গেছে। হিসাবের খাতায় বাকি আর লাল কালি।

হাশেম নিয়ম মানে—ভাড়া না পেলে ছাড় নেই। কবি হোক আর জমিদার—ঘর ছাড়তে হবে। আগামীকাল নতুন মাস। আর দশ দিন দেখবে।

একদিন সকালে লালন বের হবে, এমন সময় লালনের ঘরে ঢুকে দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো মৌসুমী—: আজ কী লিখলেন ভাই?: তুমি তো কবিতা পছন্দই করো না।: ইদানীং কিছু করি।: আজ কোনো কবিতা লিখি নাই। একটি কণিকা লিখেছি।: কই দেখি দেখি...

লালন কবিতার পৃষ্ঠাটি দিলো। মৌসুমী আবৃত্তি করতে লাগলো—‘আমার হৃদয়েও ঝাঁঝ আছে,নয় টিনের মোড়ানো প্রাণ!ফুলের আঘাতেই রক্ত ঝরেহয় কাঁচের মতো খান খান!’

স্মিত হেসে মুখ বাঁকিয়ে মৌসুমী বললো—: হেব্বি হয়েছে।: তোমার কণ্ঠ কবিতা আবৃত্তির উপযোগী। একটু তো চেষ্টা করে দেখতে পারো।

এমন সময় মৌসুমীর বাবা ঘরের ভেতর থেকে ডাকলো। ‘বাবা ডাকছে’ বলে মৌসুমী দৌড় দিয়ে চলে গেল।

সেদিন হাশেম বিড়বিড় করে বললো, ‘আজ এগারো তারিখ। ভাড়া মিটাবার নাম নেই। আজই ব্যাটাকে বিদায় করবো।’ সন্ধ্যায় সে লালনের ঘরে গিয়ে দাঁড়ালো—: তোমার সময় শেষ। সোয়া তিন মাসের ভাড়া বাকি! এক্ষুণি ঘর খালি করো।লালনের ভীষণ জ্বর। মাথা থেকে সাদা চাদরটা সরিয়ে লাল চোখ তুলেছিল। কোনো অনুনয় নেই, কোনো রাগও না।: ঠিক আছে। আজই চলে যাচ্ছি, চাচা।কিছুক্ষণ পর চলে যাওয়ার সময় মৌসুমী দৌড়ে এসেছিল।: আপনি কোথায় যাবেন এই জ্বর নিয়ে?: যেখানে শব্দেরা ডাকে।লালনের গুরুগম্ভীর জবাব।মৌসুমী কষ্টে চুপ করে ছিল। হাশেম তার চোখের দিকে তাকাতে পারেনি।

সেই রাতেই লালন চলে যায়। একটি ব্যাগ, কিছু বই, আর না-বলা অনেক কথা। হাশেম জানালার ফাঁক দিয়ে দেখে—ছেলেটা একবারও পেছনে তাকাল না।

পরদিন লালনের ঘরটা পরিষ্কার করতে গিয়ে অসংখ্য পরিত্যক্ত কাগজের সঙ্গে একটি কাগজে মৌসুমীর চোখ আটকে যায়। একটি কাগজের টুকরায় একটি কবিতাংশে।‘ঝড়ের আকাশে যে চায় পূর্ণিমার চাঁদ,তার চেয়ে জগতে বড় কে আছে উন্মাদ!সেই উন্মাদের চোখের জলেপৃথিবী যায় ভেসে,সময়ের স্রোতেমেঘ কেটে যায় নীল আকাশে,আবার তখন পূর্ণশশী হাসে!আসা–যাওয়ার খেলা চলেবদলে যাওয়া ঋতু পরিক্রমায়,মানুষ ফিরে নাহি আসেএকবার যদি সে হারায়!’

মৌসুমী ভাবে, সত্যি লালন ভাইকে ওরা হারিয়েছে চিরতরে—অনাদরে, অবহেলায়। সে একজন নিরাপদ কবি। কখনো কারো তো কোনো ক্ষতি করেনি! সে-ও তো তার বাবাকে বলে লোকটাকে রেখে দিতে পারতো। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার সে কাজে মন দেয়।

সেদিনের পর বাড়িটা আরও ফাঁকা হয়ে যায়। বাড়িটাও যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। মৌসুমী আরও ধীর–স্থির। কথাবার্তায় খুব সংযত। হাশেম মজুমদার বুঝতে পারে কিছু সিদ্ধান্ত বুমেরাং হয়ে ফেরে।

দশ দিন পর একটি মানি অর্ডার আসে। লালন চার মাসের ভাড়া পাঠায়। সেখানে কোনো ঠিকানা লেখা ছিল না।

আরও পাঁচ বছর কেটে যায়। বাড়িটা আরও ভাঙে। একদম নড়বড়ে হয়। হাশেম মজুমদার আরও নড়বড়ে হয়। মৌসুমী স্থানীয় একটি কেজি স্কুলে চাকরি পায়। অনেক সম্বন্ধ আসে, কিন্তু সে এটা-সেটা বলে এড়িয়ে যায়। সে নিজেই জানে না, সে আছে কার প্রতীক্ষায়।

একদিন ডাকপিয়ন আসে। এয়ারমেইল খাম। প্রেরক—লালন খান। চিঠিতে লেখা—‘হাশেম চাচা, আসসালামু আলাইকুম। একদিন আপনি আমাকে ঘর ছাড়তে বলেছিলেন। সেদিন আমি নিজের মন ভেঙেছিলাম। কিন্তু সেই ভাঙনই আমাকে পথ দেখিয়েছে। আজ আমি কবিতার মানুষদের সঙ্গে কাজ করি। বাবার সঙ্গে রাগ করে আপনার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমার বাবার নাম শুনলে আপনিও চিনবেন। সে যা-ই হোক, আজ বাবা নেই কিন্তু আপনি তো আছেন। আমি একদিন মাকে নিয়ে আপনার বাড়িটায় ফিরতে চাই।’

হাশেমের হাত কেঁপে ওঠে, ছেলেটাকে বাড়ি থেকে বের করার কষ্টে।

কিছুদিন পর মায়ের সঙ্গে লালন ফিরে আসে।লালনের মমতাময়ী মা, কামরুন্নাহার খান। পঞ্চান্ন বছর বয়সী সুশিক্ষিত ও কবিতাপ্রেমী। যার কোমল হৃদয় লালনের কবিতা ও মানবিকতায় জীবন্ত। লালন আগের মতোই শান্ত কিন্তু চোখে এক সূর্যের আলো। মৌসুমী তাকিয়ে থাকে।: আপনি কিন্তু বদলাননি, লালন ভাই।: কবিতা বদলায় না, মানুষ বদলায় এবং আমি বদলেছি।লালনের মা বলে—: এই মেয়ে, তুমি লালনকে আর ভাই বলবে না।মৌসুমী লজ্জায় দৌড়ে পালায়।হাশেম মজুমদারকে লালন বলে—: চাচা, আমি এই বাড়িটার সংস্কার করাতে চাই। এটা আমার দেনা।হাশেম মাথা নিচু করে বলে—: আমি কসাই মানুষ। মানুষকে শুধু কষ্ট দিতে জানি।লালন মৃদু হেসে বলে—: সব কসাই মাংস কাটে না। কেউ কেউ ভেতরের অন্ধকারও কাটে।

ফল্গুধারার সেদিন সোনাঝরা সন্ধ্যায় উঠোনে লালনের পাশে দাঁড়িয়ে মৌসুমী বলে—: এই বাড়িটা এখন আর শুধু ইট-কাঠ-পাথর না। এটা একটা জীবন্ত কবিতা। আমাদের বাড়ির নাম—‘কবিতা’।লালন কবিতা আবৃত্তি করে বলে—‘কবিকুঞ্জে পুঞ্জে পুঞ্জেকবিতায় ঘেরা চারিধার!স্বপ্ন ছোঁয়া আবীর ধোয়ামর্ত্যের স্বর্গ চির বাহার!’

আরও গল্প পড়ুনহাসান জাহিদের গল্প: অনঘ জোড়া শালিক আর স্মৃতির ভায়োলিন 

এসইউ