বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী শাসনামলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও মানবাধিকার যেভাবে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে, তার এক বীভৎস প্রতিফলন ঘটেছে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নীল নকশা বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বানানো হয়েছিল বিরোধী মত দমনের প্রধান ক্ষেত্র। বিশেষ করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর নেমে এসেছিল রাষ্ট্রীয় ও দলীয় নিপীড়নের এক ভয়াবহ স্টিমরোলার।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও (জাবি) এর বাইরে ছিল না। সেখানে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর ছাত্রলীগের ক্যাডার বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর যৌথ তাণ্ডব ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। শুধু শারীরিক নির্যাতনই নয়, মেধা ও ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হয়েছে প্রশাসনের আড়ালে থাকা মিথ্যা মামলার অস্ত্র। বিনাকারণে জেল-জুলুম মাথায় নিয়ে জাহাঙ্গীরনগরের বহু শিক্ষার্থীকে যাযাবরের মতো জীবন কাটাতে হয়েছে। ছাত্রদল করার কারণে নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্বাভাবিক শেষ টানতে পারেনি অনেকেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছাত্রদল করার অপরাধে ছাত্রত্ব শেষ করতে না পারাদের মধ্যে শাখা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইসরাফিল চৌধুরী সোহেল (৪০তম ব্যাচ), সাবেক সভাপতি ও বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা (৩৭তম ব্যাচ), বর্তমান শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর (৩৯তম ব্যাচ) এবং সাবেক সহ-সভাপতি নবীনুর রহমান নবীন (৩৯তম ব্যাচ) অন্যতম। ছাত্রলীগের হামলা এবং মিথ্যা মামলায় শিক্ষাঙ্গন থেকে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের।
অন্যদিকে, ছাত্রলীগের হামলা ও পাঁচটি মিথ্যা রাজনৈতিক মামলায় অনিয়মিতভাবে শিক্ষাজীবন শেষ করেছিলেন বর্তমান শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনীক (৪০তম ব্যাচ)। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হয়েছিল তাকে। শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ূন হাবিব হিরনেরও (৪০তম ব্যাচ) ছিল দুইটি মামলা। ছাত্রলীগের হামলা থেকে সেও রেহাই পাইনি।
ছাত্রলীগের চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বর্তমান কমিটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আফফান আলী (৩৯তম ব্যাচ)। হাত এবং পায়ের হাড় ভেঙে দেওয়া হয়। গুরুতর আঘাতে একটি কিডনি বিকল হওয়ার পর্যায়ে চলে যায়। প্রায় সাত মাস বেডে শুয়ে কাটাতে হয়েছে তাকে। এরপরও ১২টি মামলা দেওয়া হয়।
১১টি মিথ্যা মামলা ও ৬ বার কারাবরণের শিকার হন শাখার সাবেক সহ-সভাপতি ও বর্তমান কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো রাব্বি হাসানের (৩৯তম ব্যাচ)। ছাত্রলীগের হামলায় ক্যাম্পাস ছাড়তে হয়েছিল তাকে। ছাত্রলীগের হামলায় হাত-পাসহ শরীরের ১০টি হাড় ভেঙে দেওয়া হয় শাখার সাবেক সহ-সভাপতি ও বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম খলিল বিপ্লবের (৩৯তম ব্যাচ)। এখনো সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি তিনি। শরীরের একাধিক হাড়ে ইস্পাত বসানো রয়েছে।
ছাত্রদল করায় বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার হক মজুমদার শিমুলকে (৩৯তম ব্যাচ) অনিয়মিতভাবেই শিক্ষা জীবন শেষ করতে হয়। চারটি রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়েছিলেন তিনি।
শাখা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম সৈকতের (৩৮তম ব্যাচ) উপর দেশীয় অস্ত্রসহ হামলা করেছিল ছাত্রলীগ। হাত-পা ভেঙে দিয়ে মস্তিষ্কে আঘাত করা হয় তার। নির্মম অত্যাচারের পর মৃতভেবে ফেলে রাখা হয়েছিল তাকে। দীর্ঘ এক বছর চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
২০১৩ সালের ৮ এপ্রিল ছাত্রলীগের হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হন শাখা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের অসাধারণ সম্পাদক কাজী রেজাউল করিম রাজু (৩৫তম ব্যাচ)। দীর্ঘ ৬২ দিন আইসিইউতে ছিলেন এবং ছয় বছর চিকিৎসাধীন থাকার পরও স্বাভাবিক জীবনে আসতে পারেননি। এর বাইরেও ছাত্রদল করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অনেক নেতাকর্মী।
এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনীক বলেন, ছাত্রদল করার অপরাধে ছাত্রলীগের পৈশাচিক হামলা ও ৫টি মিথ্যা রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়ে আমার স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ধ্বংস করা হয়েছিল। দীর্ঘ কারাবাস আর পরিবারের ওপর ভূমি সংক্রান্ত মিথ্যা মামলার হয়রানি আমাকে চরম বিপর্যস্ত করেছে। ছাত্রলীগের সেই নৃশংস হামলার আঘাতে আজও আমি শারীরিক অসুস্থতা ও স্মৃতিশক্তি হ্রাসের মতো স্থায়ী ট্রমা নিয়ে বেঁচে আছি। সব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে এক দুঃসহ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে আমাকে শিক্ষাজীবন শেষ করতে হয়েছে।
শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছি। আমার নামে পাঁচটি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে এবং নিজ বিভাগের সামনেই ছাত্রলীগের সশস্ত্র হামলার শিকার হতে হয়েছে। আমাকে হল ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল এবং প্রশাসনের অসহযোগিতায় আমি স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় পর্যন্ত অংশ নিতে পারিনি। তবুও সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে আমরা দমে যাইনি।
তিনি আরও বলেন, দমন-পীড়ন নয়, বরং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীবান্ধব ও অধিকারমুখী রাজনীতি নিশ্চিত করতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।
এনএইচআর/এএসএম