ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর এক মাস পার হতে না হতেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট এখন ‘সবকিছুর সংকটে’ রূপ নিয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল-গ্যাস সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেবল জ্বালানির দামই বাড়েনি, বরং প্লাস্টিক, সার ও ওষুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদনেও দেখা দিয়েছে চরম বিপর্যয়।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন কমে গেছে। এতে বিশ্বে মোট সরবরাহ প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ কমে গেছে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি প্লাস্টিক, জুতা, কাপড়, ব্যাগের মতো দৈনন্দিন জিনিস তৈরির কাঁচামালও কমে গেছে।
এই প্রভাব এখন বাজারের প্রায় সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। পেট্রোকেমিক্যালের কাঁচামাল ‘ন্যাপথা’র সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্লাস্টিক, রবার ও পলিয়েস্টারের দাম হু হু করে বাড়ছে।
আরও পড়ুন>>ইরান যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে যেভাবে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারেযুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে, আঘাত হাজার মাইল দূরে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিতেহরমুজ খুললেই কাটবে না সংকট, রেশ থাকবে বহুদিন
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে এশিয়ায়, কারণ বিশ্বের অর্ধেকের বেশি পণ্য এখানে তৈরি হয় এবং তারা তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
দক্ষিণ কোরিয়ায় আবর্জনার ব্যাগ কেনার জন্য মানুষের মধ্যে হিড়িক পড়ে গেছে। তাই সরকার একবার ব্যবহারযোগ্য জিনিস কম ব্যবহার করতে বলেছে।
তাইওয়ানে প্লাস্টিক শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেক কারখানার উৎপাদন বন্ধের মুখে, রাইস মিলগুলো প্যাকেজিং সংকটে চালের দাম বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
জাপানে প্লাস্টিকের মেডিকেল টিউব সংকটে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তেলের সংকট খুব দ্রুত বিয়ার, নুডলস, চিপস, খেলনা এবং কসমেটিকস শিল্পে ছড়িয়ে পড়ছে।
মালয়েশিয়ায় রাবার ল্যাটেক্স তৈরির উপজাত উপাদানের অভাবে বিশ্ববাজারে মেডিকেল গ্লাভসের সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ভারতে প্লাস্টিকের বোতলের ছিপির দাম চারগুণ বেড়ে যাওয়ায় বোতলজাত পানির দাম বাড়ছে। কনডম তৈরিতে প্রয়োজনীয় সিলিকন অয়েল ও অ্যামোনিয়ারও সংকট দেখা দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানিতে বিঘ্ন ঘটায় যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকরা ইউরিয়ার জন্য এক-তৃতীয়াংশ বেশি দাম দিচ্ছে।
বিপর্যয়ের মুখে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিআন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এক ব্লগ পোস্টে সতর্ক করেছে, এই যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ধীরগতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্লাস্টিক রেজিনের দাম গত ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় ৫৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বিজনেস ইন্টেলিজেন্স ফার্ম ‘দেজান শিরা অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’-এর ড্যান মার্টিন বলেন, ‘তেল ও শিপিং বিপর্যয় থেকে ন্যাপথা ও ভোক্তা পণ্যে এই রূপান্তর অত্যন্ত দ্রুত ঘটছে।’ তার মতে, সেমিকন্ডাক্টর, গাড়ির যন্ত্রাংশ এবং খাদ্য গ্রেডের প্যাকেজিংয়ের মতো সংবেদনশীল শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি বিপদে রয়েছে।
বিকল্পের খোঁজে মরিয়া দেশগুলোসংকট মোকাবিলায় দক্ষিণ কোরিয়া রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল থাকার সুযোগ নিয়ে মস্কো থেকে ন্যাপথা আমদানি শুরু করেছে এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে নিজস্ব রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে।
অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো খরচ কমাতে প্লাস্টিকের মোড়কের পুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ কাগজ বা কাঁচের ব্যবহারের চিন্তা করলেও তা সময়সাপেক্ষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এপ্রিল মাস থেকে এই সংকট আরও তীব্র হতে পারে। কারণ যুদ্ধের আগে পাঠানো শেষ তেলের চালানগুলো এরই মধ্যে বাজারে চলে এসেছে। জেপি মরগানের বিশ্লেষকদের মতে, ‘চ্যালেঞ্জ এখন শুধু দামের নয়, বরং পণ্যের আকাল বা দুষ্প্রাপ্যতার।’
হরমুজ প্রণালি যদি আগামীকালও খুলে দেওয়া হয়, তবু এশিয়ার প্লাস্টিক ও অন্যান্য শিল্পখাতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
সূত্র: সিএনএনকেএএ/