আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে যেভাবে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:৫৮ পিএম, ১৮ মার্চ ২০২৬
বিশ্বজুড়ে দেখা দিতে পারে খাদ্য সংকট/ প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি এখন দ্বিমুখী সংকটের মুখে। গত ২ মার্চ ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ডস কর্পসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারি ঘোষণা করেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা হয়েছে। এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়। এই ঘোষণার পর তেলের দাম একলাফে ১০০ ডলার প্রতি ব্যারেল ছাড়িয়ে যায়।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের পাশাপাশি একটি অন্য সংকটও সামনে আসছে, তা হলো সারের ঘাটতি। এর কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কেন হবে সারের ঘাটতি?

বিশ্বের বাণিজ্যিক ইউরিয়ার প্রায় অর্ধেক এবং অন্যান্য অনেক ধরনের সারই উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে রপ্তানি হয়। সুতরাং এই অঞ্চলে ব্যাঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে কৃষি কার্যক্রম বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আরও পড়ুন>>
তেলের দাম বাড়লে খাদ্যপণ্যের দাম কেন বাড়ে?
তেল-গ্যাস থেকে জ্বালানি ছাড়াও যেসব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি হয়
যুদ্ধের মধ্যে রুশ তেল কিনতে এশিয়ায় কাড়াকাড়ি

সম্প্রতি গ্যাস সরবরাহ ও জাহাজ চলাচলে ব্যাঘাতের কারণে গ্যাস ব্যবহার করে সার উৎপাদনকারী কারখানাগুলো বন্ধ বা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত এনার্জি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি তার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন স্থগিত করার পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইউরিয়া কারখানাটি বন্ধ করেছে।

বিপাকে কৃষিপ্রধান দেশগুলো

সারের এই ঘাটতি বিশেষ করে এশীয় এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে:

ভারত: দেশটি তার প্রয়োজনের ৪০ শতাংশ ইউরিয়া ও ফসফেট সার মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। সংকটের কারণে ভারত এরই মধ্যে তাদের তিনটি ইউরিয়া কারখানায় উৎপাদন কমিয়েছে।

বাংলাদেশ: গ্যাস সংকটের কারণে বাংলাদেশের পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ হয়ে গেছে।

ব্রাজিল: বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সয়াবিন রপ্তানিকারক দেশটি তাদের প্রয়োজনীয় সারের প্রায় অর্ধেকই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আমদানি করে। সারের অভাবে সেখানে উৎপাদন ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র: বর্তমানে দেশটিতে সারের মজুত স্বাভাবিকের চেয়ে ২৫ শতাংশ কম।

মধ্যপ্রাচ্যের সার কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

শিপিং সার্ভিস প্রতিষ্ঠান সিগনাল গ্রুপ জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে সারের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয় উপসাগরীয় দেশগুলোতে। ইউরিয়ার ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ৪৬ শতাংশ। কাতার ফার্টিলাইজার কোম্পানি একাই বিশ্বের ১৪ শতাংশ ইউরিয়া সরবরাহ করে।

ক্রমবর্ধমান ঘাটতির কারণে এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরিয়ার রপ্তানি দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে। জ্বালানি ও পণ্যের মূল্য প্রতিবেদনকারী বিশেষায়িত সংস্থা আর্গাসের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার পর্যন্ত এর দাম প্রতি মেট্রিক টনে ৫০০ ডলারের কিছু কম থেকে বেড়ে ৭০০ ডলারের বেশি হয়েছে। এই দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।

তথ্য বিশ্লেষণী সংস্থা কেপলার জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে বিশ্বজুড়ে সারের এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে। মর্নিংস্টারের বিশ্লেষক সেথ গোল্ডস্টাইন জানিয়েছেন, নাইট্রোজেন সারের দাম প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে, আর ফসফেটের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

কোন দেশগুলো বেশি নির্ভরশীল?

২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার দেশগুলো সারের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি হওয়া ইউরিয়ার ৩৫ শতাংশ, সালফারের ৫৩ শতাংশ এবং অ্যামোনিয়ার ৬৪ শতাংশ পায়।

ভারত, ব্রাজিল ও চীনের মতো বড় দেশগুলোর কৃষি বাজারের জন্যে মধ্যপ্রাচ্যের সার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত তার ইউরিয়া ও ফসফেট সারের ৪০ শতাংশের বেশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। ব্রাজিল প্রায় সম্পূর্ণরূপে আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক সরবরাহ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে।

এছাড়া মরক্কো, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ায়ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সার আমদানি করে।

খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব

ভারত, চীন, ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম বড় খাদ্য উৎপাদক, বিশেষ করে চাল, গম, ডাল এবং ফলের ক্ষেত্রে। ২০২৪ সালে ভারতের চাল রপ্তানির প্রায় এক চতুর্থাংশ বিশ্বের বাজারে গিয়েছিল।

চীন একটি প্রধান চা উৎপাদনকারী দেশ, যা বিশ্বজুড়ে চা পাতা সরবরাহ করার পাশাপাশি রসুন ও মাশরুমের মতো অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যও উৎপাদন করে।

ব্রাজিল বিশ্বের সয়াবিনের প্রায় ৬০ শতাংশ রপ্তানি করে। তারা চিনি এবং ভুট্টাও সরবরাহ করে। চীন চা, রসুন, মাশরুমসহ অন্যান্য কৃষি পণ্যের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী।

সুতরাং, দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি এবং মূল্যের ঊর্ধ্বগতি কৃষকদের সার ব্যবহার না করার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এতে ফসলের ফলন কমতে পারে। ফলে বিশ্বজুড়ে চাল, গম, ভুট্টা, সয়াবিনের মতো প্রধান ফসলের সরবরাহ কমে যাবে। এতে খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়া এবং আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোতে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।

সূত্র: আল-জাজিরা
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।