দেশজুড়ে

তেল সংকটে সেচ না পেয়ে হতাশায় কৃষক

জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে চরম উদ্বেগ ও হতাশা বিরাজ করছে গাইবান্ধার কৃষকদের মাঝে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে সেচ নির্ভর কৃষকরা। শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি, সারের উচ্চ মূল্য ও পানির স্তর নেমে যাওয়ায় খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার পরও তেল সংকট যেন কৃষকদের মড়ার ওপর খাড়া ঘা-এর মতো অবস্থা হয়েছে।

কৃষকদের দাবি, দ্রুত সময়ে মধ্য তেলের সমস্যা সমাধান না করতে পারলে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার দিগন্ত জুড়ে সবুজের সমরোহ। সবুজ ধান গাছ, দোল খাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন। কৃষকরা শরীর ঘামা ফসল গোলায় তুলতে দিন গুনছেন। এর মধ্যই তাদের মাথায় হাত। হঠাৎ করে তেল সংকটের কারণে ভালো মতো বোরে আবাদের ভরা মৌসুমে জমিতে সঠিক সময়ে পানি দিতে পারছেন না। অনেক জমির ধানের শীষ বের হওয়ার উপক্রম। সেসব জমিতে পানি নেই। অনেক জমি পানির অভাবে মাটি ফেঁটে গেছে। যে সময় কৃষকের মুখে হাসি থাকার কথা, সেই সময় তাদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। অনেক কৃষক তেলের জন্য এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ঘুরছেন। দুই-তিনবার ঘোরার পরও মিলছে না তেল।

কৃষি বিভাগ বলছে, সেচ যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃষকদের পানির অপচয় রোধেও সচেতন হতে হবে। এসব পরামর্শ কৃষকদের দিতে মাঠপর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি মৌসুমে এবার জেলায় এক লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর বোরো আবাদসহ প্রায় এক লাখ ৬৭ হাজার ২৯৪ হেক্টর জমিতে আবাদ রয়েছে।

কৃষকরা বলেন, বোরো ধানের জমিতে এ সময়ে নিয়মিত সেচ প্রয়োজন। ধানের গোড়ায় সব সময় পানি ধরে রাখতে হবে। জমিতে একদিন পর পর সেচ দিতে হয়। কিন্তু পাম্পে গিয়ে পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় সেচ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষকদের হিসেবে, এক বিঘা জমিতে বোরো ধান উৎপাদন খরচ হয় প্রায় ১৬-১৭ হাজার টাকা। সেখানে প্রতি বিঘায় গড়ে ধান উৎপাদন হয় ২৪-২৬ মণ।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার লক্ষীপুরের কৃষক মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, তেল পাম্পে গেলে এক লিটার থেকে সর্বোচ্চ দুই লিটার তেল দিচ্ছে। তেল পাওয়া না গেলে বোরো ধানের জমিতে পর্যাপ্ত সেচ দিতে পারছি না। এখন বোরো ধানে খুব পানির দরকার পড়ে।

সুন্দরগঞ্জের হরিপুর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, ডিজেল না পেয়ে সময়মতো জমিতে পানি দেওয়া যাচ্ছে না। ধানের চারা শুকিয়ে যাচ্ছে। এখন যদি পানি না দেই, পুরো ফসলই নষ্ট হয়ে যাবে।

সদর উপজেলার বোয়ালীর কৃষক রহিম উদ্দিন বলেন, আগে পাম্পে গেলেই তেল পাওয়া যেত, এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। তেলের দামও বেড়েছে, ফলে খরচ বেড়ে গেছে দ্বিগুণ।

গোবিন্দগঞ্জের বিশুবাড়ির কৃষক মজনু মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। সেচ দিতে না পারলে ফসল হবে না, আর ফসল না হলে পরিবার চালানোই কঠিন হয়ে যাবে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, জ্বালানি সংকটের কারণে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বোরো মৌসুমে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কৃষকদের লোকসান আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

তেল পাম্প মালিকরা বলছেন, চাহিদা তুলনায় কম পরিমাণ তেল আসায় এ সমস্যা হচ্ছে। তবে যতটুকু তেল পাওয়া যায়, তা সবাইকে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা জানান, এসময় ধানের জমিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি ধরে রাখতে হবে। কয়েক দফায় বৃষ্টি হওয়ার কারণে ধানের জমিতে সেচ দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। তবে এ সময়ে জমিতে পানির সেচের প্রয়োজন রয়েছে। যে সকল কৃষক শ্যালো মেশিনে আবাদ করছেন, তারা তেল সংকটের কারণে জমিতে পানি দিতে পারছেন না।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণের উপ-পরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন, বোরো ধানের জমিতে পানি থাকতে হবে। এসময় জমিতে পানি ধরে রাখতে না পারলে ফসল হানির শঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

আনোয়ার আল শামীম/এমএন/জেআইএম