ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণে কার্ডভিত্তিক পেমেন্টে ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)। অ্যামচেম জানায়, প্রস্তাবিত প্রণোদনার মধ্যে ৩ শতাংশ গ্রাহক এবং ২ শতাংশ ব্যবসায়ীরা পেতে পারেন।
রোববার (৫ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর এনবিআর ভবনে আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় সংগঠনটি এই প্রস্তাব করে।
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে এনবিআর ও সংগঠনগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রস্তাবের পক্ষে অ্যামচেম জানায়, কোভিড-পরবর্তী সময়ে ভোক্তারা ক্রমশ অনলাইন শপিং ও ডিজিটাল পেমেন্টের দিকে ঝুঁকছে, যার মধ্যে কার্ড এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) উল্লেখযোগ্য। এই পরিবর্তনের ফলে ই-কমার্স খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছে, নগদের ওপর নির্ভরতা কমেছে এবং লেনদেনের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য অর্থ স্থানান্তর আরও সহজ করেছে।
ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার আরও বাড়াতে ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়ার সুপারিশ করে সংগঠনটি। যেখানে ৩ শতাংশ ভোক্তা এবং ২ শতাংশ ব্যবসায়ীরা পাবেন। তারা বলছে, উদ্যোগটি ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার ঘটাবে, স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং একটি নগদনির্ভরতা কম অর্থনীতির (ক্যাশ-লাইট ইকোনমি) বিকাশে সহায়তা করবে। প্রাথমিকভাবে এই প্রণোদনা ব্যাংক, ব্যবসায়ী বা এমএফএস সেবাদাতারা প্রদান করতে পারে এবং পরে সংশ্লিষ্ট তথ্য অর্থ মন্ত্রণালয় এবং/অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়ার মাধ্যমে সমন্বয় করা যেতে পারে।
আসন্ন জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়নে একাধিক সুপারিশ তুলে ধরে অ্যামচেম। এর মধ্যে করনীতি সহজীকরণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংগঠনটি দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি (ডিটিএ) অনুযায়ী সরাসরি করহার প্রয়োগের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করে। এতে ব্যাংকগুলোকে আলাদা করে ডিটিএএ সনদ সংগ্রহ করতে হবে না। তবে সনদ প্রয়োজন হলে আবেদন জমার সাতদিনের মধ্যে তা প্রদানের ব্যবস্থারও সুপারিশ করা হয়েছে।
উৎসে কর কর্তনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। তারা বলছে, রুল ৩৯ অনুযায়ী কর্পোরেট কর নির্ধারণ করলে উৎসে কর ৪ দশমিক ১২৫ শতাংশ এবং অন্যথায় ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিদেশি ও স্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য সমান করহার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ বজায় রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে স্মার্টকার্ড ও পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিনের ওপর শুল্ক ১৫ শতাংশের নিচে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক কাঠামোয় পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে কার্বনেটেড পানীয়র ওপর সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়।
অ্যামচেমের মতে, বর্তমানে পানীয় খাতে মোট করভার ৫৪ শতাংশ হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, ভোক্তা চাহিদা কমছে এবং বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। করহার কমানো হলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব—তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এছাড়া তৈরি পোশাক খাতের বর্জ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ সেবাকে ভ্যাট অব্যাহতির আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেন পুনর্ব্যবহার শিল্প শক্তিশালী হয়। বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ বাড়াতে অ-বাসিন্দা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য করহার কমানোর সুপারিশও করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই) ব্যক্তিগত আয়করের সর্বোচ্চ হার ২০ শতাংশ নির্ধারণ এবং ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের ওপর সারচার্জ মওকুফের প্রস্তাব দিয়েছে। তারা গার্মেন্টস শিল্পে ৫০ শতাংশ কাঁচামাল দেশীয় উৎস থেকে সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করার সুপারিশও করে।
বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ব্যক্তিগত আয়করসীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ, ট্রেড লাইসেন্স ফি ৫০ শতাংশ কমানো এবং নারী উদ্যোক্তাদের শোরুমে ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব দিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যবসায়ী সংগঠন ইউরোচ্যাম বিনিয়োগবান্ধব করনীতি, প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের ওপর জোর দিয়েছে। তারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ডিজিটালাইজেশন উদ্যোগের প্রশংসা করলেও নীতিমালা ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান দূর করার আহ্বান জানায়।
এসএম/ইএ