মতামত

সংবিধান সংশোধন: এবারও কী ২০১০ সালের পুনরাবৃত্তি হবে

গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয় ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর—যেটি কার্যকর হয় বিজয়ের প্রথম বার্ষিকীতে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এরপর এখন পর্যন্ত ১৭ বার এই সংবিধানে সংশোধনী আনা হয়েছে। কখনো এক, কখনো বা একাধিক অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের জন্য এসব সংশোধনী আনা হয়েছে। এর মধ্যে একবারে সবচেয়ে বেশি সংশোধনী বা সংবিধানে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আনা হয় ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনীর সময়। ওই সংশোধনীর সময় মূলত বাহাত্তরের মূল সংবিধানের মূলনীতিসহ অনেক বিধান ফিরিয়ে আনা হয়—যে-সব বিধান পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন করা হয়েছিল।

২০১০ সালের জুলাই মাসে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর জন্য জাতীয় সংসদ একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে এবং এই সংশোধনী নিয়ে তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে টানাপড়েন তৈরি হয়। এর ১৫ বছর পরে এবার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের আলোকে সংবিধান সংশোধনের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা থাকলেও রাষ্ট্রপতির ওই আদেশকে অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং ‘অন্তহীন প্রতারণার দলিল’ বলে আখ্যা দিয়েছে সরকারি দল বিএনপি। তারা সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে—যা নিয়ে বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপির সঙ্গে তাদের কিছুটা টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। সংবিধান সংশোধন নিয়ে এবারও ২০১০-১১ সালের পুনরাবৃত্তি হবে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আছে। তবে সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে দেখা যাক সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর ইস্যু নিয়ে কী কী হয়েছিল।

২০১০ সালের ২১ জুলাই তৎকালীন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে চেয়ারপার্সন এবং আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে কো-চেয়ারম্যান করে সংবিধান সংশোধনে ১৫ সদস্যের বিশেষ কমিটি করা হয়। তখন সরকারের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রথমে সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়েই এই কমিটি গঠন করা হয়।

দেশের মানুষ বিশ্বাস করে, সংবিধান সংশোধনসহ অন্য যে-কোনো বিষয়ে ছাপিয়ে এই মুহূর্তে সরকারের এক নম্বর অগ্রাধিকার হতে হবে জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলা করা তথা দাম না বাড়িয়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। যানবাহনে জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে যাতে কোনোভাবেই খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। বিরোধী দলের উচিত হবে এই জাতীয় সংকট কাটাতে সরকারের পাশে থাকা। সংবিধান সংস্কার বা জুলাই সনদের মতো দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুগুলো নিয়ে প্রয়োজনে কিছুদিন পরেও আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের সুযোগ রয়েছে।

প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কাছে এই কমিটির জন্য নাম চাওয়া হলেও তারা কোনো নাম দেয়নি। বরং তারা কমিটি গঠনের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে। এদিন রাতে গুলশানে বিএনপির চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে চারদলীয় জোট ও সমমনা দলগুলোর বৈঠকে খালেদা জিয়া বলেন, ‘বাকশালে ফিরে যাওয়ার জন্যই সংবিধান সংশোধনের এই অপচেষ্টা হচ্ছে।’

তবে বিএনপি এই কমিটিতে নিজেদের নাম না দিলেও ২০১০ সালের ২০ এপ্রিল তাদেরকে বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দেয় বিশেষ কমিটি। ২৫ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়ে খালেদা জিয়াকে চিঠি দেন কমিটির চেয়ারপার্সন সাজেদা চৌধুরী। কিন্তু ২৫ এপ্রিল কমিটিকে পাল্টা চিঠি দেন খালেদা জিয়া। সেখানে তিনি লেখেন, ‘সংবিধান সংশোধনের জন্য যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তা দুরভিসন্ধিমূলক। সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার অপকৌশল মাত্র। এ বৈঠক অর্থবহ হবে না।’

বিশেষ কমিটি সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত প্রতিবেদন সংসদে পেশ করে ২০১১ সালের ৮ জুন এবং ২০ জুন এটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। এদিন বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে এক আলোচনা সভায় ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সংবিধানের সংশোধনী অনুমোদন দিয়ে সরকার আলোচনার পথ রুদ্ধ করেছে। এটা সরকারের বাকশালি নীতির বহিঃপ্রকাশ। এখন দেশের মানুষকে সচেতন করতে বিএনপি কর্মসূচি দেবে বলে জানান তিনি।

২০১১ সালের ৩০ জুন দুপুরে সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাসের পরে ওইদিন বিকালেই তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া গুলশানে তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। এতে তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের সব সম্ভাবনা তিরোহিত হলো। এই অপচেষ্টায় দেশে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠলো। গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের সব পথ রুদ্ধ হয়ে গেল। তিনি বলেন, সংশোধনের পর সংবিধান আওয়ামী লীগের দলীয় ইশতেহারে পরিণত হয়েছে। দেশবাসী ও বিএনপির প্রতিবাদের মূল্য না দিয়ে তারা সেই (সংবিধান সংশোধন) ঘৃণ্য কাজটি করলেন। বেগম জিয়া বলেন, সংবিধান নিয়ে সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা, জালিয়াতি, জোচ্চুরি, প্রবঞ্চনা ও প্রতারণার পর তারা এটি সংশোধন করে জাতীয় ইতিহাসে আরেকটি কালো অধ্যায়ের সৃষ্টি করলো।

প্রশ্ন হলো, এবার কী হবে?জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে বিরোধী দলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ গত ৩১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষ থেকে একটি বিকল্প প্রস্তাব দেন। সেটি হলো, সংবিধান সংশোধনের জন্য সরকারি ও বিরোধী দলীয় সদস্যদের সমন্বয়ে একটি সংসদীয় কমিটি গঠন। প্রাথমিকভাবে তার এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সরকারি ও বিরোধী দল থেকে সমানসংখ্যক সদস্য নিয়ে এই কমিটি গঠনের পরামর্শ দেন। প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে বিএনপিও কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী দলের সমানসংখ্যক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানিয়েছিল।

গত পয়লা এপ্রিল জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনে ১৫ থেকে ২০ সদস্যের একটি কমিটি হবে। সেখানে বিরোধী দলসহ সকল দলের প্রতিনিধিদের রাখতে চাই। সকলের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা সংবিধান সংশোধনের কমিটি করতে চাই।’ যদিও এদিন বিকালেই এই ইস্যুতে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।

তার মানে এবারও কি সরকারি দলের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটিতে নাম দেওয়া থেকে বিরত থাকবে বিরোধী দল? কেননা, বিরোধী দল কমিটিতে সমানসংখ্যক প্রতিনিধিত্ব রাখার যে দাবি করেছে, সেটি যৌক্তিক কারণেই সরকারি দল তথা বিএনপির পক্ষে মেনে নেয়া কঠিন। কারণ সংসদে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে স্বভাবতই বিএনপির দুই তৃতীয়াংশ সদস্য থাকার কথা। তবে বিএনপি যদি বিরোধী দল থেকে সমানসংখ্যক সদস্য নিতে সম্মত হয়, সেটি হবে তাদের উদারতা।

বিশেষ কমিটি সংবিধান সংশোধন বিল চূড়ান্ত করে সংসদে উত্থাপনের পরে সেটি দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে অনুমোদিত হতে হবে। বিএনপির যেহেতু দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, অতএব সংবিধান সংশোধন বিলে তাদের কণ্ঠস্বরই প্রাধান্য পাবে। তবে এবারের সংসদে যারা আছে, তারা সবাই যেহেতু জুলাই অভ্যুত্থানের শরিক, অর্থাৎ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ১৭ বছরের আন্দোলন সংগ্রামের বিএনপি ও জামায়াত যেহেতু একসঙ্গেই ছিল, ফলে কিছু বিষয়ে তাদের মধ্যে মতানৈক্য থাকলেও সংবিধান সংশোধন ইস্যুতে তাদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত খুব বেশি বিরোধ হবে বলে মনে হয় না।

জুলাই সনদে সংবিধান সংশোধন/সংস্কারের জন্য যে ৪৮টি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তার অধিকাংশেরই সঙ্গেই বিএনপি একমত। কিছু বিষয়ে তারা ভাষাগত পরিবর্তন করতে চায়। দুয়েকটি প্রস্তাবের সঙ্গে হয়তো তারা একেবারেই একমত নয়। সুতরাং কোন কোন বিধান কীভাবে সংবিধানে যুক্ত করা হবে, সেই আলোচনটি বিশেষ কমিটিতে হতে পারে। তারপর একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। তবে কমিটির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত নয়। বরং বিলটি পাস করতে হবে সংসদের দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতিতে। সেখানে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা না হলে সংবিধান সংশোধন বিল পাসের সময়ই বড় ধরনের বিতর্ক হতে পারে। তবে ২০১০-১১ সালের মতো পরিস্থিতি এবার ঘটবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। কারণ সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের আগে থেকেই এবার সংসদ ও রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।

গণভোটের রায় মেনে সংস্কারের মাধ্যমে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবিতে ৪ এপ্রিল রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। তাদের অভিযোগ, সংবিধান সংশোধনের মতো ‘রুটিন কাজের’ জন্য জুলাই বিপ্লব হয়নি, বরং ছিল রাষ্ট্র কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তনের জন্য। গণভোটে জনগণ যে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন না করা মানে আগের ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। জনমতের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিলে তা মেনে নেওয়া হবে না জানিয়ে দাবি আদায়ে রাজপথে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন জোটের শীর্ষ নেতারা।

সত্যিই যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন বা পরিবর্তনের দাবিতে বিরোধী দল ও তাদের জোট অটল থাকে এবং সংসদ অধিবেশনেও এ নিয়ে তারা ওয়াকআউট অব্যাহত রাখে; যদি সত্যিই তারা ২০১০ সালের বিরোধী দলের মতো বিশেষ কমিটিতে নাম দেওয়া থেকে বিরত থাকে, তাহলে দেশ কী বড় ধরনের কোনো সংকটে পড়বে মনে রাখতে হবে, দেশ এমনিতেই একটা সংকটের ভেতরে পড়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে পুরো বিশ্বে। জ্বালানি তেলের সরবরাহে ছন্দপতন ঘটেছে। সরকার যদিও বলছে যে জ্বালানি তেলের সংকট নেই, কিন্তু পাম্পের পরিস্থিতি সে কথা বলছে ন। বরং জ্বালানি তেল নিয়ে দেশ যে একটা বড় সংকটে পড়তে যাচ্ছে, তার কিছু লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে। যদি তাই হয় তাহলে এর প্রভাব পড়বে উৎপাদনসহ সর্বত্র। সুতরাং সেই সংকটের ভেতরে যদি জুলাই সনদ তথা সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে সরকারের সাথে বিরোধীদের টানাপড়েন বাড়ে, সেটি দেশের জন্য কল্যাণকর হবে ন।

দেশের মানুষ বিশ্বাস করে, সংবিধান সংশোধনসহ অন্য যে-কোনো বিষয়ে ছাপিয়ে এই মুহূর্তে সরকারের এক নম্বর অগ্রাধিকার হতে হবে জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলা করা তথা দাম না বাড়িয়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। যানবাহনে জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে যাতে কোনোভাবেই খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। বিরোধী দলের উচিত হবে এই জাতীয় সংকট কাটাতে সরকারের পাশে থাকা। সংবিধান সংস্কার বা জুলাই সনদের মতো দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুগুলো নিয়ে প্রয়োজনে কিছুদিন পরেও আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের সুযোগ রয়েছে। বরং আপাতত জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সরকারি ও বিরোধী দল যদি অভিন্ন সুরে কথা বলতে পারে, তাতেই দেশ ও মানুষের কল্যাণ।

লেখক : সাংবাদিক ও লেখক।

এইচআর/এএসএম