ধরলা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই জনপদ একসময় ছিল প্রাণচঞ্চল। মোগলহাট স্থলবন্দর, যা মোগলহাট-গীতালদহ সীমান্ত নামেও পরিচিত, ব্রিটিশ আমলে (১৮৮৭-৮৮ সালে) রেলপথে ভারত ও আসামের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ট্রেনের হুইসেল, যাত্রীদের ভিড় আর পণ্যবাহী বগির শব্দে মুখর থাকত পুরো এলাকা।
কিন্তু সময়ের নির্মমতায় সব থেমে যায়। বন্যার আঘাতে থেমে যায় রেল চলাচল, স্তব্ধ হয়ে পড়ে বন্দরের কার্যক্রম। প্রায় ৩৯ বছর ধরে নীরব পড়ে আছে রেললাইনগুলো, যেন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অপেক্ষা করছে নতুন দিনের। আজও লালমনিরহাট জেলা শহর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে এই জায়গায় গেলে চোখে পড়ে সেই পুরোনো রেলস্টেশনের কিছু অবশিষ্ট সৌন্দর্য। মরিচা ধরা লাইন, ভাঙাচোরা স্থাপনা আর স্মৃতির ভারে নুয়ে পড়া প্ল্যাটফর্ম, সবকিছু যেন গল্প বলে এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের।
এই নীরবতার মাঝেই বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কিছু মানুষ। ধরলা নদীর ভাঙনে বসতভিটা হারানো অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন এই পরিত্যক্ত স্টেশনের কোণায়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে গেলেও, তাদের কাছে এটি আশ্রয়ের শেষ ঠিকানা।
তবে এই গল্পে শুধু হতাশা নেই, আছে সম্ভাবনাও। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মোগলহাট এখন নতুন করে পরিচিত হচ্ছে একটি অনন্য পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে। প্রতিদিন নানা বয়সের মানুষ এখানে ভিড় জমাচ্ছেন। উৎসবের সময় তো এটি হয়ে ওঠে জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান।
একদিকে ধরলা নদীর অপরূপ সৌন্দর্য, অন্যদিকে সীমান্তে বিজিবি ক্যাম্পের উপস্থিতি, আর সেই সঙ্গে ব্রিটিশ আমলের রেলস্টেশনের স্মৃতি,সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন ইতিহাস আর প্রকৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন।
স্থানীয়দের দাবি স্পষ্ট, মোগলহাট স্থলবন্দর পুনরায় চালু করা হোক। এতে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে, অর্থনীতির চাকা ঘুরবে নতুন গতিতে। আর যদি তা সম্ভব না হয় এখনই, তবে অন্তত এটিকে পরিকল্পিত পর্যটন এলাকায় রূপান্তর করা হোক, যাতে এই অবহেলিত সম্পদ মানুষের কাজে আসে।
স্থানীয় তরুণ বাসিন্দা আবু হায়াত জিম বলেন, ‘অনেকদিন থেকে দেখে এসেছি বন্দরটি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে, বন্দরটি চালু হলে শ্রমিক কৃষক দিনমজুর মানুষদের ভালো হতো আর ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসা করার সচ্ছলতা বৃদ্ধি পেত। আমরা যারা যুবক আছি তাদেরও কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হতো। কর্মসংস্থান পেতাম। বিগত সময়ে বাংলাদেশের যে সরকার এসেছে তাদের সংসদরা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছিলেন। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি এই সরকারের কাছে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন চাই।’
স্থানীয় প্রবীন বাসিন্দা খলিলুর রহমান বলেন, ‘এখানে এক সময় ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট-কাস্টম ছিল। রেলওয়ে স্টেশন ছিল। সেখান থেকে ট্রেন ছেড়ে যেন ইন্ডিয়ার দিকে। বিকেলে আবার ফিরে আসত একটি ট্রেন। এই ট্রেনগুলোতে পাথর, কাঠ, গম, চাল, বিভিন্ন মালামাল আসত দেশে। এই বন্দরটি বন্ধ হওয়াতে অনেকগুলো কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে মানুষ কর্ম হারিয়েছে, এটি আবার চালু হোক সরকারের কাছে আমাদের এটাই দাবি।’
সন্তানকে নিয়ে বন্ধ এই বন্দরে ঘুরতে এসেছেন ফরহাদ হোসেন। সন্তানকে দেখাচ্ছেন ধল্লা নদী বাংলাদেশের সীমান্ত। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন বিকেলে এখানে প্রচুর লোকের সমাগম হয় এখন দর্শনার্থী আসতে শুরু করেছে। মোগলহাটবাসী হিসেবে আমাদের দাবি এটি যদিও স্থলবন্দর হওয়ার আলোচনা চলছে, দুটি দেশের জন্য দ্বিপাক্ষিক বিষয় হয়েছে। আপাতত আমার দৃষ্টিতে যদি এটি লালমনিরহাট জেলার ছোট্ট একটি পর্যটন গড়ে তোলা হয়। তাহলে দর্শনার্থীরা আসবেন। এতে এখানকার মানুষের জীবিকার পথ খুলে যাবে। এরই মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই অঞ্চলটি খুবই জনপ্রিয়।’
স্থানীয় সুশীল ব্যক্তি সুফিয়া আল হাসান বলেন, ‘অনেকেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু পদ পরিবর্তনের পর তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রাখেনি। লালমনিরহাট জেলার নাগরিক হিসেবে বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া। পুনঃবিবেচনা করে মোগলহাটের বন্দরটি যেন চালু করে। এতে করে দুই দেশের সম্পর্ক বাড়বে সঙ্গে এই জেলার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আমরা মনে করি।’
মোগলহাট তাই শুধু একটি পরিত্যক্ত বন্দর নয়, এটি এক অসমাপ্ত গল্প,যেখানে অতীত, বর্তমান আর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে নতুন এক সূচনার। বর্তমান লালমনিরহাট ৩ আসনের সংসদ সদস্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু তিনি বলেছেন, আমি আমার বন্দরের মন্ত্রণালয়কে ডিও লেটার দিয়েছি এবং বন্দর মন্ত্রীকে আহ্বান জানিয়েছি উনি শিগগিরই এটা ভিজিট করতে আসবেন।
আরও পড়ুনগরমে ঘুরতে গেলে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবেআরব সাগরের নীল জলরাশি ছুঁয়ে যে শহরমহসীন ইসলাম শাওন/কেএসকে