আরব সাগরের নীল জলরাশি ছুঁয়ে যে শহর
আরব সাগরের নীল জলরাশি আর বাতাসের সুরে বোনা ওমানের অন্যতম বৃহত্তম শহর সুর। যেখানে ইতিহাসের ছাপ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বন্দর নগরীর স্মৃতি এবং ভ্রমণের আবেগ একত্রে মিলিত হয়ে অতীত ও বর্তমানকে জীবন্ত ক্যানভাসে রাঙিয়ে তোলে। আরব সাগরের নীল বিস্তারের বুক চিরে যখন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিলাম, দূর থেকে প্রথম যে দৃশ্যটি আমার চোখে ধরা দিলো; সেটি ছিল এক নিঃশব্দ পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে থাকা সেই সমুদ্রের বাতিঘর। যেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সে এই শহরের আগমন-প্রস্থান, সুখ-দুঃখ, বাণিজ্য আর সভ্যতার গল্প নীরবে লিপিবদ্ধ করে যাচ্ছে। সেই বাতিঘরকে সামনে রেখে যে শহরটি গড়ে উঠেছে, তার নাম সুর। ওমানের অনন্য বন্দর নগরী, যেখানে ইতিহাস, প্রকৃতি আর মানুষের জীবন যেন এক সুতোয় বাঁধা।
শহরের দিকে যতই এগোতে থাকলাম; ততই স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগলো এর সৌন্দর্য। আরব সাগরের পাশে গড়ে ওঠা এই শহরের বাড়ি-ঘরগুলো যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা রঙিন ক্যানভাস। কোথাও হালকা নীল, কোথাও মাটির রং, কোথাও আবার সাদা আর হলুদের মিশেলে তৈরি স্থাপত্য—সবকিছু মিলিয়ে এক অপূর্ব নান্দনিকতা। অনেক পুরোনো বাড়ি-ঘর দেখেছি, যেগুলোর দেওয়ালে সময়ের ছাপ স্পষ্ট। তবুও সেগুলোতে লুকিয়ে আছে এক গর্বিত অতীতের গল্প। মনে হচ্ছিল, প্রতিটি ইট, প্রতিটি জানালা যেন আমাকে কিছু বলতে চাইছে। কোনো এক বিস্মৃত যুগের কথা। যখন এই শহর ছিল সমুদ্র বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
সুর শুধু একটি শহর নয়, এটি একটি অনুভূতি। আশ শারকিয়াহ দক্ষিণ গভর্নরেটের রাজধানী এই শহর একসময় ছিল উত্তর-পূর্ব ওমানের প্রাণকেন্দ্র। মাস্কাট থেকে প্রায় দুইশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হলেও এর গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। ষোড়শ শতাব্দীর শুরু থেকেই এটি আরব সাগরের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চল ও ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী এক গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসেবে পরিচিত ছিল। ভাবতেই অবাক লাগে, এই শান্ত, সুন্দর শহর একসময় কত ব্যস্ত আর কোলাহলপূর্ণ ছিল জাহাজে ভরা বন্দর, ব্যবসায়ীদের আনাগোনা, আর দূরদেশের পণ্যের আদান-প্রদান।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে সুরের গৌরবগাথা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ষষ্ঠ শতাব্দীতেই এটি পূর্ব আফ্রিকার সাথে বাণিজ্যের একটি প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা এই শহরকে বর্ণনা করেছিলেন ‘সমুদ্রতীরের একটি বড় গ্রামের পোতাশ্রয়’ হিসেবে। সেই সময়ের সুর ছিল প্রাণচঞ্চল, সম্ভাবনায় ভরপুর। পরবর্তীতে ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগিজদের দখলে চলে যায় শহরটি, কিন্তু ওমানি ইমাম নাসির ইবনে মুরশিদের নেতৃত্বে এটি আবার স্বাধীনতা ফিরে পায়। সেই পুনর্জাগরণের পর সুর আবারও ভারত ও পূর্ব আফ্রিকার সাথে বাণিজ্যে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। তবে সময়ের নিষ্ঠুরতা থেকে রেহাই পায়নি এই শহরও। ব্রিটিশদের দাস ব্যবসা নিষিদ্ধকরণ এবং সুয়েজ খাল খোলার ফলে এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমে যায়।
তবুও সুরের প্রাণশক্তি আজও অটুট। শহরের অলিগলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি অনুভব করছিলাম সেই অতীতের ছোঁয়া। কোথাও কাঠের দরজায় জটিল কারুকাজ, কোথাও পুরোনো জানালায় খোদাই করা নকশা—সবকিছু যেন ইতিহাসের জীবন্ত নিদর্শন। এখানকার মানুষও ঠিক তেমনই আন্তরিক আর সহজ-সরল। যারা তাদের ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে আধুনিকতার পথে।
প্রকৃতির দিক থেকেও সুর এক অনন্য বিস্ময়। শহরের কাছেই রয়েছে ওয়াদি শাব এক রোমাঞ্চকর উপত্যকা, যেখানে পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা মিষ্টি জলের ধারা গিয়ে মিশেছে সমুদ্রের নোনাজলে। এই অদ্ভুত মিলন যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব সিম্ফনি। নৌকা পার হয়ে, পাহাড়ি পথ ধরে হেঁটে যখন ভেতরের দিকে এগোচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল আমি যেন এক রহস্যময় জগতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। স্বচ্ছ পানির ছোট ছোট পুল, পাথরের গায়ে সূর্যের আলো, আর চারপাশে নিস্তব্ধতা—সব মিলিয়ে এক অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতা।

আরেকটু দূরে ওয়াদি তিউই এক সবুজ উপত্যকা, যা মরুভূমির দেশের মধ্যে এক টুকরো স্বর্গের মতো। তালগাছ আর কলাগাছের সারি, মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির ধারা, আর দূরে সুউচ্চ পাহাড়—সব মিলিয়ে এক শান্ত, প্রশান্ত পরিবেশ। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব ব্যস্ততা যেন দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে। প্রকৃতির এই নিস্তব্ধ সৌন্দর্য মানুষের মনকে এক অন্যরকম প্রশান্তি দেয়।
সুরের ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে কালহাত শহরের সাথে। একসময় এটি ছিল ওমানের প্রথম রাজধানী এবং একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্র। আজ যদিও এটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, তবুও এর প্রতিটি পাথর যেন অতীতের গল্প বলে। বিবি মরিয়মের সমাধি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। একজন শক্তিশালী নারীর স্মৃতি, যিনি একসময় এই অঞ্চলের শাসক ছিলেন। সেই সমাধির নিস্তব্ধতা যেন সময়কে থমকে দেয়, আর মনে করিয়ে দেয় ইতিহাসের অনিত্যতা।
শহরের প্রতিরক্ষার ইতিহাসও কম চমকপ্রদ নয়। সিনেসিলা দুর্গ, বিলাদ সুর ফোর্ট, আর আল-আইজাহ দুর্গ প্রতিটি স্থাপনা যেন অতীতের যুদ্ধ আর সংগ্রামের সাক্ষী। সমুদ্রপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই দুর্গগুলো একসময় শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতো, আর আজ তারা ইতিহাসের নীরব স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এই দুর্গগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে যখন দূরের সমুদ্রের দিকে তাকালাম, মনে হচ্ছিল যেন আমি সময়ের এক ভিন্ন স্তরে দাঁড়িয়ে আছি।

সুরের আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো—এর ঐতিহ্যবাহী জাহাজ নির্মাণ শিল্প। এখানকার কারিগররা আজও কাঠের তৈরি বিশাল পালতোলা জাহাজ বানান; যেগুলো একসময় ভারত, আফ্রিকা, এমনকি চীন পর্যন্ত যেত। সেই জাহাজগুলোর গায়ে লেগে আছে হাজারো অভিযানের গল্প। একটি জাহাজ নির্মাণ কারখানায় গিয়ে দেখলাম, কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই শিল্প আজও জীবন্ত রয়েছে। কাঠের গন্ধ, হাতুড়ির শব্দ, আর কারিগরের নিখুঁত দক্ষতা সব মিলিয়ে এটি এক জীবন্ত ঐতিহ্য।
সুর থেকে কিছু দূরে রয়েছে রাস আল-জিনজ এবং রাস আল-হাদ্দ যেখানে প্রকৃতি তার আরেকটি বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে। এখানে প্রতি বছর হাজার হাজার সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপ ডিম পাড়তে আসে। রাতের অন্ধকারে সৈকতে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখা এ যেন এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা। প্রকৃতির এই চক্র, এই নিঃশব্দ জীবনচক্র আমাদের শেখায় ধৈর্য, সহনশীলতা আর অস্তিত্বের গভীরতা।
পুরো ভ্রমণজুড়ে একটি বিষয় বার বার মনে হয়েছে—সুর শুধু একটি শহর নয়, এটি সময়ের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এখানে অতীত আর বর্তমান পাশাপাশি হাঁটে, ইতিহাস আর প্রকৃতি একসাথে গল্প বলে, আর মানুষ সেই গল্পেরই অংশ হয়ে বেঁচে থাকে। এই শহরের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি মানুষ আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে—জীবন আসলে কত সুন্দর, কত গভীর।

সত্যিই, সবকিছু মিলিয়ে সুরে কাটানো সময় ছিল এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা; যেখানে আমি শুধু একটি শহর দেখিনি, আমি অনুভব করেছি এক ইতিহাস, এক সংস্কৃতি, এক জীবনের স্পন্দন। এই স্মৃতিগুলো আমার ভেতরে চিরকাল বেঁচে থাকবে, ঠিক সেই সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো, যা কখনো থামে না, শুধু বার বার ফিরে আসে নতুন গল্প নিয়ে।
এসইউ