বর্তমান সময়ের শিশু-কিশোরদের জীবনে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তারের কারণে অল্প বয়সেই অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে। তবে এই ব্যবহারের সঙ্গে বাড়ছে নানা ধরনের ঝুঁকিও। বিশেষ করে অনলাইন হয়রানি, সাইবার বুলিং কিংবা অপরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধের শিকার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে প্রি-টিনএজ বা ১৩ বছরের কম বয়সী অনেক শিশু এরই মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি বেশ আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি আরভিন মেডিক্যাল সেন্টারের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রায় ৪০ শতাংশ প্রি-টিনএজ শিশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি শক্তিশালী আকর্ষণ বা আসক্তির লক্ষণ দেখাচ্ছে। এতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করা, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা বা বিভিন্ন গ্রুপে যুক্ত হওয়া—এসব কর্মকাণ্ড অনেক সময় শিশুদের বিপদের মুখে ফেলতে পারে। অনলাইন প্রতারণা, সাইবার বুলিং, এমনকি শিশু পাচার বা পর্নোগ্রাফির মতো অপরাধের সঙ্গেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার জড়িয়ে আছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে শিশুদের জন্য আরও নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করতে উদ্যোগ নিচ্ছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানি মেটা প্ল্যাটফর্মস একটি নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে প্রি-টিনএজ শিশুরাও মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করতে পারবে।
তবে এই ব্যবহারে থাকবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। শিশুদের জন্য তৈরি করা এই বিশেষ সংস্করণটি মূলত অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। অর্থাৎ শিশুরা সরাসরি নিজেরা সবকিছু পরিচালনা করতে পারবে না; বরং অ্যাকাউন্ট তৈরি থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পদক্ষেপে অভিভাবকের অনুমতি লাগবে।
এই নতুন ব্যবস্থায় একটি বিশেষ প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সুবিধা রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে অভিভাবকেরা সন্তানের অ্যাকাউন্টের বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। আলাদা একটি ড্যাশবোর্ডের সাহায্যে তারা দেখতে পারবেন শিশু কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে বা কী ধরনের ব্যবহার করছে অ্যাপটি।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতাও রাখা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, অপরিচিত কারও সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা যাবে না। অজানা গ্রুপে যোগ দেওয়ার সুযোগও সীমিত থাকবে। এছাড়া স্ট্যাটাস আপডেট করা বা কিছু ধরনের মিডিয়া শেয়ার করার অপশন বন্ধ রাখা হতে পারে। কোনো অপ্রাসঙ্গিক বা ঝুঁকিপূর্ণ কনটেন্ট এলে সেটি আটকাতে বিশেষ ফিল্টার ব্যবস্থাও থাকবে।
বিশ্বের অনেক দেশে শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি রয়েছে। অনেক জায়গায় নির্দিষ্ট বয়সের নিচে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয় না। কারণ বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প বয়সে অনিয়ন্ত্রিতভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে মানসিক চাপ, আসক্তি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় শিশুদের জন্য নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করাই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অভিভাবকের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হলে শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তুলনামূলক নিরাপদ করা সম্ভব।
আরও পড়ুনহোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ ব্যাকআপ রাখা যাবে গুগল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেহোয়াটসঅ্যাপের সব চ্যাট পড়তে হবে না, সামারি জানাবে অ্যাপকেএসকে