মির্জা ফারিহা ইয়াসমিন স্নেহাআমাদের সমাজে মানুষ সবসময় নারী ও পুরুষের সমান অধিকার নিয়ে কথা বলে। কিন্তু কখনো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সমান অধিকার নিয়ে কথা বলে না। সমাজ তাদের কে কখনো আর দশজন মানুষের মতো ভাবে না, তাদের কে সবসময় কোণঠাসা করে রাখা হয়। কিন্তু তারা ও আমাদের মতো মানুষ। তাদের সমাজে নাগরিক হিসেবে বাঁচার অধিকার আছে। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ কোনো বোঝা না বরং তাদের ও সমাজের অংশ।
তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বলতে এমন ব্যক্তিদের বোঝানো হয়, যাদের লিঙ্গ পরিচয় পুরুষ বা নারী এই দুটি প্রচলিত সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না; তারা শারীরিকভাবে উভলিঙ্গ হতে পারে, অথবা কোনো লিঙ্গের বৈশিষ্ট্যই নাও থাকতে পারে, আবার অনেকে নিজেদের নন-বাইনারী হিসেবে চিহ্নিত করেন, যা আন্তঃলিঙ্গ বা তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া জনগোষ্ঠীকে বোঝায়।
তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর অধিকার বলতে বোঝায় সমাজের সব সুবিধা, মর্যাদা ও সুযোগসমূহ তারা অন্যদের মতো সমভাবে ভোগ করবে এই নিশ্চয়তা। তবে জন্মগত বা অর্জিত লিঙ্গপরিচয় যাই হোক না কেন, প্রত্যেক মানুষই স্বাধীনভাবে নিজের পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে এবং সেই পরিচয়ের স্বীকৃতি পাওয়া তাদের মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশে ২০১৩ সালে হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ কে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
এ জনগোষ্ঠীর মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, ভোটদান ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন নাগরিক অধিকারে অংশগ্রহণের যোগ্য। কিন্তু আইনগত স্বীকৃতির পরও তারা প্রায়শই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও জনসাধারণের জীবনে বৈষম্য, অপমান, নির্যাতন ও সহিংসতা শিকার হন যা মানবাধিকারের পরিপন্থী। তাদের কে মানুষ সব সময় এড়িয়ে চলে এবং পরিবারের মানুষরাও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। তাদের কে স্কুল, কলেজ রাস্তাঘাট ,কর্মসংস্থান সব জায়গায় অবহেলা চোখে দেখা হয়। মানুষ সব সময় তাদের লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে হাসি তামাশা করে। সমাজে বৈষম্যের শিকারের তার শিক্ষা দীক্ষা থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। মানুষের অবহেলার কারণে তারা কাজ করতে পারে না। পেটের দায়ে চাঁদাবাজি করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।
এমনি একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ রোকসানা আহমেদ। তিনি বলেন, ‘সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তিন ভাই বোনের মধ্যে দ্বিতীয় রোকসানা। আট বছর বয়সে পরিবারের মানুষ যখন বুঝতে তার নির্দিষ্ট কোনো লিঙ্গ পরিচয় নেই। তখন তার পরিবার গ্রামে তার নানি বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। প্রাইমারি স্কুলের পর তারা পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে তার পরিবার তার খোঁজ খবর নেওয়া বন্ধ করে দেয়। তাকে সবসময় ঘরের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা হত। রোকসানার শৈশব কেটেছে বাবা-মা, ভাইবোনের আদর স্নেহ ছাড়া, ঘরবন্দি অবস্থায়।’
রোকসানার মতো আরেকজন পিয়া জান্নাত জানান, তাকে তার পরিবারের মানুষ বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। খেয়ে না খেয়ে রাস্তার রাত পার করতে হয়েছে। এখন মাঝে মধ্যে ছোট ছোট কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।
রাজশাহীর জুলি তার কষ্টের কথা বলেন, ‘আমি কিছু একটা দোকানে চাকরি করতাম কিন্তু কিছুদিন পর দোকানের মালিক আমাকে বলে তুমি আমার দোকানে কাজ করতে পারবা না। তোমার কারণে আমার দোকানে বেচাকেনা কমে যাচ্ছে। পরবর্তীতে মানুষের কাছে হাত পেতে চলতে হয়। পরবর্তীতে তিনি তার নানি বাড়িতে থেকে পালিয়ে তার তৃতীয় লিঙ্গের সহকারীর সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। মাঝে মধ্যে তিনি ছোট কাজ করেন। তাছাড়া প্রায় সময় তাকে সহকর্মীদের সঙ্গে চাঁদাবাজি করতে হয়।’
শুধু রোকসানা আহমেদ, জুলি কিংবা পিয়া জান্নাত নয়, তার মতো অনেক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ রয়েছে। যাদের মানুষ শুধু নির্দিষ্ট লিঙ্গ পরিচয় না থাকার কারণে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। হিজড়া কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে দেশে মোট হিজড়া সংখ্যা ১৫ লাখ। কিন্তু তারা রাষ্ট্রের নাগরিক তাদেরও আর দশটা মানুষের মতো সমান মর্যাদা পাওয়া অধিকার রয়েছে।
মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র, ১৯৪৮ এর ধারা এক এ বলা আছে, সব মানুষ স্বাধীনভাবে সমান মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তাদের বিবেক এবং বুদ্ধি আছে; সুতরাং সবারই একে অপরের প্রতি ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোভাব নিয়ে আচরণ করা উচিৎ। এছাড়া ধারা ২-এ কারো প্রতি কোনো বৈষম্য নয় ও ধারা ৬-এ মানুষের পৃথিবীতে সর্বত্র সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। যা ঐতিহ্যগতভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় স্বীকৃত এবং বর্তমানে বাংলাদেশেও আইনগত স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এখনো বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।
তাই শুধু আইনি স্বীকৃতি নয়, বাস্তব জীবনে সমান সুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, সমাজ ও পরিবার সবারই দায়িত্ব রয়েছে। এর জন্য প্রথমে সামাজিক সচেতনতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। তাদের সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়নে হিজড়া জনগোষ্ঠীর বাসস্থান ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি।
সব স্তরে তাদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। তাদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতো পড়াশোনা করে শিক্ষিত করার পাশাপাশি সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করতে পারবে। তারা পড়াশোনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে। ফলে আত্মনির্ভরশীল হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে তাদের জন্য উপযোগী কর্মক্ষেত্রের ব্যবস্থা করা এবং স্বাভাবিক পেশায় যুক্ত হতে উৎসাহিত করা। আবার বিভিন্ন হিজড়া প্রশিক্ষণালয়ে প্রশিক্ষণের পরিবর্তে অবহেলা ও হেনস্তার শিকার হচ্ছে অনেক। তা তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করতে হবে।
হিজড়াদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। তাহলে চুরি, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ হবে। তাছাড়া পারিবারিক সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার, ভোটদান, নিরাপত্তা, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে হবে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মতো সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যক্রম আরও জোরদার করা উচিত। তাছাড়া বেসরকারি সংস্থা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে তাদের জীবনমান উন্নয়নে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। যাতে করে তারা সমাজের মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে এবং রাষ্ট্রের আদর্শ নাগরিক আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ কে সমাজের বোঝা না ভেবে, সমান নাগরিক হিসেবে গণ্য করা উচিত। এতে তারা সকল অবহেলা ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, মার্কেটিং বিভাগ, রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী।
আরও পড়ুননারীর সঙ্গে পরিবেশ, পরিবেশের সঙ্গে উন্নয়নফুটপাতে ভাতের হোটেল: ঢাকার শ্রমজীবীদের ৩ বেলা আহারের ভরসাকেএসকে