ফুটপাতে ভাতের হোটেল: ঢাকার শ্রমজীবীদের ৩ বেলা আহারের ভরসা
ঢাকার ব্যস্ত সড়ক, অফিসপাড়া কিংবা বাজারসংলগ্ন এলাকায় হাঁটলেই চোখে পড়ে ফুটপাতের ছোট ছোট খাবারের দোকান। আমরা এসব দোকানকে বলি ‘ভাতের হোটেল’। কয়েকটি টেবিল-টুল, অ্যালুমিনিয়ামের হাড়ি, প্লেট-বাটি আর অতি প্রয়োজনীয় কিছু মালামাল নিয়ে গড়ে ওঠা এই অস্থায়ী রেস্তোরাগুলো যেন শহরের এক অপরিহার্য খাদ্যব্যবস্থা। নগর জীবনের এগুলো শুধু খাবারের জায়গা নয়, বরং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এক টুকরো স্বস্তি।
প্রতিদিনের আয়ের উপর নির্ভরশীল রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, অফিসের নিম্নপদস্থ কর্মচারী কিংবা পথের ফেরিওয়ালাদের জন্য এসব হোটেল যেন আশীর্বাদ। তাদের জন্য মধ্যম বা উচ্চমানের রেস্তোরাঁয় খাওয়া প্রায় অসম্ভব। এই শূন্যস্থান পূরণ করছে ফুটপাতের ভাতের হোটেলগুলো। অল্প টাকায় পেট ভরে খাওয়ার সুযোগ এখানে সহজলভ্য। ফার্মগেট, মতিঝিল, কারওয়ান বাজার, সায়েদাবাদ ও পুরান ঢাকার অলিগলিতে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব অস্থায়ী হোটেলের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো।
এসব হোটেলে সাধারণত খুব সাধারণ অথচ পেটভরা খাবার পাওয়া যায়। মেনুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মোটা চালের ভাত ও ঘন ডাল। সবজি তো থাকবেই। ছোট মাছ, পাঙ্গাশ বা তেলাপিয়া মাছের ঝোল, ব্রয়লার মুরগি এবং আলুভর্তা থাকে। অনেক হোটেলে ৫-১০ টাকায় বিভিন্ন ধরনের ভর্তা ও শুঁটকির পসরা সাজানো থাকে। ১০ টাকায় ভাতের থালা, ২০ টাকায় শাক, ২০-২৫ টাকায় ডিম, ৫০-৮০ টাকায় মাছ-মুরগী। সঙ্গে থাকে বিনামূল্যে মসুর ডাল। এমন সুলভ মূল্যের খাবার শহরের অন্য কোথাও পাওয়া কঠিন। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এটি শুধু খাবার নয়, বেঁচে থাকার সহায়।
ঢাকার মিরপুর এলাকায় রিকশা চালান সোহেল মিয়া। প্রতিদিনই তিনি এমন কোনো না কোনো খাবারের দোকানে দুপুরের খাবার খান। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিন রিকশা চালাই। সারাদিন রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কাজ করি। আয় খুব বেশি না যা পাই, তা দিয়েই সংসার চালাতে হয়। তাই আমাদের মতো মানুষের জন্য এই ফুটপাতের হোটেলগুলো খুব দরকার। এখানে ৫০-৬০ টাকায় মাছ-ভাত খেতে পারি, ডাল তো ফ্রিই দেয়। অন্য কোথাও গেলে একই খাবারের জন্য দ্বিগুণ টাকা লাগে, যা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। তাছাড়া কাজের ফাঁকে কাছেই খাবার পাওয়া যায়, বেশি সময় নষ্ট হয় না।’
তবে এই সহজলভ্যতার পেছনে রয়েছে নানা বাস্তবতা ও দ্বন্দ্ব। আইনগত দিক থেকে এসব ফুটপাতের হোটেলের অধিকাংশই অবৈধ। ট্রেড লাইসেন্স নেই, স্বাস্থ্যবিধির পূর্ণ নিশ্চয়তা নেই, আর সবচেয়ে বড় বিষয় রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে এগুলো মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি বড় সমস্যা, যা শহরের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন তোলে।
স্বাস্থ্যঝুঁকিও উপেক্ষা করার মতো নয়। অনেক ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ পানির অভাব, অপরিষ্কার পরিবেশ, সংরক্ষণের অনিয়ম সব মিলিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবুও বাস্তবতা হলো, যারা এখানে খায় তাদের কাছে এসব ঝুঁকি প্রায় অনিবার্য। কারণ বিকল্প হিসেবে সুলভ, নিরাপদ ও সহজলভ্য খাবারের ব্যবস্থা শহরে খুবই সীমিত।
অন্যদিকে, এই ছোট ব্যবসাগুলো হাজারো মানুষের জীবিকার উৎস। অল্প পুঁজিতে গড়ে ওঠা এসব দোকান অনেক পরিবারের আয়ের একমাত্র ভরসা। প্রতিদিনের বিক্রিতেই চলে সংসার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা সবকিছু। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসব হোটেলের প্রায় ৫০ শতাংশই পরিচালনা করেন নারীরা। তারা সারাদিন নিজেদের ঘরে রান্না সেরে সন্ধ্যায় খাবারগুলো নিয়ে ফুটপাতে বসেন। তাই এই হোটেলগুলো বন্ধ হয়ে গেলে শুধু ক্রেতারাই নয়, বিক্রেতারাও বড় ধরনের সংকটে পড়বেন।
ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় ফুটপাতে এমনই একটি খাবার দোকান খুলেছেন করিম মিয়া। তিনি বলেন, ‘প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই ফুটপাতে হোটেল চালাই। খুব বেশি পুঁজি ছিল না, তাই ছোট করে শুরু করি। এখন এই দোকানটাই আমার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। প্রতিদিন ভোরে বাজার করি, তারপর রান্না শুরু করি। চেষ্টা করি কম দামে ভালো খাবার দিতে, কারণ আমাদের ক্রেতারা বেশিরভাগই রিকশাওয়ালা, শ্রমিক তাদের আয় কম। তারা যদি এখানে না খায়, তাহলে হয়তো ঠিকমতো খেতেই পারবে না।
তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, আমাদের দোকানগুলো নিয়মমাফিক না। লাইসেন্স নেই, জায়গাটাও নিজের না। মাঝে মাঝে উচ্ছেদের ভয় থাকে, তখন খুব দুশ্চিন্তা হয়। কিন্তু কী করব? অন্য কোনো কাজের সুযোগও তো নেই। আমার মতো অনেকেই এই ছোট ব্যবসার ওপর নির্ভর করে পরিবার চালাচ্ছে। যদি সরকার আমাদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা করে দিত, আর সহজে লাইসেন্স দিত, তাহলে আমরা নিয়ম মেনেই ব্যবসা করতে পারতাম। এতে আমাদেরও নিরাপত্তা থাকত, আর ক্রেতারাও নিশ্চিন্তে খেতে পারত।’
নগর বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যা ও সম্ভাবনার এই দ্বৈত বাস্তবতায় ফুটপাতের হোটেলগুলোকে পুরোপুরি অবহেলা করা বা হঠাৎ উচ্ছেদ করা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন একটি মানবিক ও বাস্তবসম্মত নীতি। সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ, সহজ শর্তে লাইসেন্স প্রদান, স্বাস্থ্যবিধি প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত তদারকি এসব উদ্যোগ গ্রহণ করলে একদিকে যেমন শহরের শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, অন্যদিকে এই অনানুষ্ঠানিক খাদ্যব্যবস্থাও টিকে থাকবে নিরাপদভাবে।
ঢাকার ফুটপাতের হোটেল তাই কেবল একটি খাবারের দোকান নয় এটি শহরের অর্থনীতি, সামাজিক বাস্তবতা এবং মানবিকতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সঠিক পরিকল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে এই ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোই হতে পারে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কেএসকে