খেলাধুলা

২০ বছরের অপেক্ষার অবসান: বিশ্বমঞ্চে ফিরলো চেক প্রজাতন্ত্র

দীর্ঘ দুই দশকের আক্ষেপ ঘুচিয়ে অবশেষে ফিফা বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ফিরলো চেক প্রজাতন্ত্র। সর্বশেষ ২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপে দেখা গিয়েছিল ইউরোপের এই দলটিকে। এরপর ২০ বছর কেটে গেছে বহু চড়াই-উতরাইয়ে। অবশেষে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখতে উত্তর আমেরিকায় পা রাখতে যাচ্ছে তারা।

এবারের আসরে ‘গ্রুপ এ’-তে চেক প্রজাতন্ত্রের সঙ্গী হিসেবে থাকছে স্বাগতিক মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ কোরিয়া।

যেভাবে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করলো চেক প্রজাতন্ত্র

চেক প্রজাতন্ত্রের ২০২৬ বিশ্বকাপের পথটা ছিল সিনেমার চেয়েও বেশি সিনেমেটিক। উয়েফা প্লে-অফে পরপর দুটি ম্যাচে পেনাল্টি শুটআউটে জয় তুলে নিয়ে তারা অসাধ্য সাধন করেছে। প্লে-অফ সেমিফাইনালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রাগে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও দমে যায়নি চেক ফুটবলাররা। প্যাট্রিক শিকের পেনাল্টি আর লাদিস্লাভ ক্রেজচির শেষ মুহূর্তের গোলে সমতায় ফিরে টাইব্রেকারে জয় পায় তারা।

ফাইনাল প্লে-অফে ডেনমার্কের বিপক্ষেও নির্ধারিত সময় ২-২ সমতায় থাকার পর টাইব্রেকারে বাজিমাত করে মিরাস্লাভ কিউবেকের শিষ্যরা। পেনাল্টিতে চেক গোলরক্ষকের বীরত্ব আর মিশাল সাদিলকের শেষ শটটি দেশটিকে পৌঁছে দেয় বিশ্বমঞ্চে।

৭৪ বছর বয়সে ত্রাতা হয়ে এলেন কউবেক

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইভান হাসেক যখন ফারো আইল্যান্ডের কাছে হেরে চাকরি হারান, তখন চেক ফুটবলে চলছিল অস্থিরতা। সেই মুহূর্তে দলের হাল ধরেন ৭৪ বছর বয়সী অভিজ্ঞ কোচ মিরোস্লাভ কউবেক। স্পার্তা প্রাগের সাবেক এই গোলরক্ষক এবং ভিক্টোরিয়া প্লাজেনের সাবেক কোচ দায়িত্ব নিয়েই পরপর দুটি প্লে-অফ জিতে দলকে বিশ্বকাপের মূল পর্বে তুলে আনেন।

বিশ্বকাপের সূচি (গ্রুপ এ)

১১ জুন: দক্ষিণ কোরিয়া বনাম চেক প্রজাতন্ত্র (এস্তাদিও গুয়াদালাজারা)১৮ জুন: চেক প্রজাতন্ত্র বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা (আটলান্টা স্টেডিয়াম)২৪ জুন: চেক প্রজাতন্ত্র বনাম মেক্সিকো (মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম)

ফিরে দেখা ইতিহাস

চেক প্রজাতন্ত্র আগে চেকোস্লোভাকিয়া হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ নিত। তাদের ইতিহাসের সোনালী সময় ছিল ১৯৩৪ এবং ১৯৬২ সাল, যখন তারা বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছিল এবং দু’বারই রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল।

কনফেডারেশন: উয়েফা (ইউরোপ)সেরা সাফল্য: রানার্স-আপ (১৯৩৪, ১৯৬২)প্রথম বিশ্বকাপ: ১৯৩৪ (ইতালি)সর্বশেষ বিশ্বকাপ: ২০০৬ (জার্মানি)অংশগ্রহণ সংখ্যা: ১০ বার (১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, l১৯৮২, ১৯৯০, ২০০৬ ও ২০২৬)সামগ্রিক রেকর্ড: ৩৩ ম্যাচ, ১২ জয়, ৫ ড্র, ১৬ হার (গোল করেছে ৪৭টি, হজম করেছে ৪৯টি)

অম্লমধুর স্মৃতি ও পরিসংখ্যান

সর্বোচ্চ গোলদাতা: স্পার্তা প্রাগের কিংবদন্তি ওলড্রিচ নেজেদলি ৭টি গোল নিয়ে চেক প্রজাতন্ত্রের সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ গোলদাতা। ১৯৩৪ বিশ্বকাপে তিনি একাই করেছিলেন ৫ গোল (জার্মানির বিপক্ষে হ্যাটট্রিকসহ)। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৯০ সালে যখন ইতালিতে বিশ্বকাপ চলছিল, ঠিক সে সময়ই এই কিংবদন্তি মৃত্যুবরণ করেন। টমাস স্কুহরাভি ৫ গোল নিয়ে তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছেন।

রেকর্ড ম্যাচ: ডিফেন্ডার লাদিস্লাভ নোভাক তিনটি বিশ্বকাপ মিলিয়ে রেকর্ড ১২টি ম্যাচ খেলেছেন। তিনি ১৯৬২ সালের রানার্স-আপ দলের অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন।

বড় জয়: ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ৬-১ গোলে বিধ্বস্ত করেছিল তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়া। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই তাদের সবচেয়ে বড় জয়।

স্মরণীয় মুহূর্ত: ১৯৩৪ সালে জার্মানির বিপক্ষে নেজেদলির হ্যাটট্রিক এবং ১৯৬২ সালে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে অ্যাডলফ শেরারের শেষ মুহূর্তের জোড়া গোল চেক ফুটবলের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। এছাড়া ১৯৯০ বিশ্বকাপে কোস্টারিকাকে ৪-১ গোলে হারানোর ম্যাচে টমাস স্কুহরাভির হ্যাটট্রিকটি ছিল দেখার মতো।

২০০৬ সালে চেক প্রজাতন্ত্র নামে অংশ নিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শুভসূচনা করলেও ঘানা ও ইতালির কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল। এবার ২০ বছরের লম্বা বিরতির পর প্যাট্রিক শিক ও লাদিস্লাভ ক্রেজচিদের হাত ধরে উত্তর আমেরিকায় নতুন কোনো রূপকথা লিখতে চায় চেক সমর্থকরা।

আইএইচএস/