মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) যখন ইরানকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, আজ রাতেই ‘একটি সভ্যতা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে’, তখন যুদ্ধের উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ইরানও জানিয়ে দিয়েছিল, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব কূটনৈতিক পথ বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু এর মাত্র ১০ ঘণ্টা পরেই নাটকীয়ভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়। প্রশ্ন উঠেছে, এই ১০ ঘণ্টায় আসলে কী ঘটেছিল?
যদিও যুক্তরাষ্ট্র এই সাফল্যের কৃতিত্ব পাকিস্তানকে দিয়েছে, কিন্তু ভারতীয় গণমাধ্যমের দাবি—শেষ মুহূর্তে চীনের হস্তক্ষেপই এই চুক্তি নিশ্চিত করেছে।
নেপথ্যে চীনের ভূমিকাভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের দাবি, যুদ্ধের এক মাস ধরে চীন নীরব থাকলেও, পর্দার আড়ালে তারাই ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী। যখন পাকিস্তান মধ্যস্থতা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল, তখন তারা বেইজিংয়ের সহায়তা চায়। ট্রাম্প নিজেও পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন, ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে চীন চাপ প্রয়োগ করেছে। এএফপির এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি শুনেছি চীন এতে জড়িত ছিল।’
আরও পড়ুন>>ইরান: বিশ্বের বুকে নতুন পরাশক্তির উত্থান?হরমুজ প্রণালিতেই ডুবতে পারে মার্কিন ডলারের ‘দাদাগিরি’পাকিস্তান যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধ থামালো
এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের ফলে ইরানে দুই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় চীন সরাসরি তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওপর পাকিস্তানের চেয়ে চীনের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি।
জাতিসংঘে চীন-রাশিয়া জোটযুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টা আগে চীন ও রাশিয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব আটকে দেয়। ওই প্রস্তাবে শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। চীন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে জানায়, এটি ইরানের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। মূলত চীন ও রাশিয়ার এই সমর্থনই ইরানকে দরকষাকষিতে শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছিল।
পাকিস্তানকে কৃতিত্ব দেওয়ার কৌশলট্রাম্প তার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান অসিম মুনিরের প্রশংসা করলেও চীনের নাম উল্লেখ করেননি। ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ শানাকা আনসেলম পেরেরার মতে, এটি একটি কৌশল। চীনকে কৃতিত্ব দিলে বিশ্বমঞ্চে তাদের ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের সমান বলে প্রতিষ্ঠিত হতো, যা ট্রাম্প চাননি। তাই মার্কিনিদের কাছে নিজের দুর্বলতা লুকাতে তিনি পাকিস্তানকে সামনে রেখেছেন।
শাহবাজ শরীফের ‘ড্রাফট’ পোস্ট নিয়ে বিতর্কপাকিস্তানের মধ্যস্থতা নিয়ে সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের একটি পোস্টের কারণে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি একটি বার্তা পোস্ট করেন, যার শুরুতে লেখা ছিল ‘ড্রাফট - পাকিস্তান পিএমস মেসেজ’। এটি দেখে অনেকে দাবি করেছেন, এই বার্তাটি পাকিস্তান নিজে লেখেনি; বরং এটি হোয়াইট হাউজ থেকে লিখে পাঠানো হয়েছিল, যা শাহবাজ শরীফ সরাসরি ‘কপি-পেস্ট’ করেছেন। মার্কিন সাংবাদিক রায়ান গ্রিম এবং গবেষক অ্যাডাম কোচরান একে পাকিস্তানের ‘মার্কিন পুতুল’ হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
এমনকি প্রখ্যাত পাকিস্তানি সাংবাদিক হামিদ মীরও বলেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল কেবল একজন ‘সহায়তাকারী’র, প্রকৃত ‘মধ্যস্থতাকারী’র নয়।
চীনের লাভ কী?চীন কেন এই যুদ্ধ থামাতে মরিয়া ছিল? এর উত্তর: অর্থনৈতিক স্বার্থ।
চীন বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বা যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দখল করলে চীনের তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতো।
চীন বীমাবিহীন পুরোনো জাহাজের মাধ্যমে ইরানের কাছ থেকে সস্তায় তেল পায়। যুদ্ধ বাড়লে এই পথ বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি ছিল। এছাড়া, বিশ্ব অর্থনীতি অস্থিতিশীল হলে চীনের পণ্য রপ্তানিও ক্ষতিগ্রস্ত হতো।
সেক্ষেত্রে, পাকিস্তান হয়তো আলোচনার পথ খোলা রেখেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপই ইরানকে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য করেছে। ভারতীয় মিডিয়ার মতে, পাকিস্তান এখানে কেবল একটি মাধ্যম ছিল, আসল চাল চেলেছে বেইজিং।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডেকেএএ/