জাতীয়

ঢাকার গৃহস্থালিতে জ্বালানির ত্রিমুখী সংকট

রাজধানীতে প্রতিদিন কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যানবাহনের জন্য জ্বালানি তেল সংগ্রহে দীর্ঘ লাইন এখন দেশজুড়ে আলোচিত বিষয়। কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও নির্ধারিত পরিমাণ পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে ভোক্তাদের।

যানবাহনের জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি রাজধানীর বাসাবাড়িতে নিত্যদিনের রান্না এখন এক অনিশ্চয়তার নাম। পাইপলাইনে গ্যাসের ঘাটতি, বিকল্প হিসেবে এলপিজির আকাশছোঁয়া দাম এবং রান্নার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কখনও কখনও লোডশেডিং- এই তিনের চাপে নগরজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য এই সংকট এখন শুধু দৈনন্দিন দুর্ভোগ নয় বরং এক গভীর মানসিক ও আর্থিক চাপের কারণ হয়ে উঠেছে।

একটি পরিবারের গল্প, হাজারো বাস্তবতা

পুরান ঢাকার লালবাগের বাসিন্দা গৃহবধূ মনোয়ারা বেগম। বুধবার সকালে স্বামী ও দুই সন্তানের জন্য পছন্দের মিক্সড ভেজিটেবল রান্না করতে গিয়ে পড়েন চরম বিপাকে। তিতাসের গ্যাস চুলার নব ঘুরিয়েও আগুন জ্বলে না কারণ লাইনে গ্যাস নেই।

ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা খালি এলপিজি সিলিন্ডার যেন অসহায়তার প্রতীক। হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন সিলিন্ডার কেনা হয়নি। শেষ ভরসা হিসেবে ইন্ডাকশন কুকারে রান্না শুরু করলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই লোডশেডিং হয়। অর্ধরান্না অবস্থায় পড়ে থাকে খাবার।

ক্ষোভের সুরে তিনি বলেন, ‘প্রতিমাসে গ্যাসের বিল দিই, কিন্তু দিনের বেলায় গ্যাস পাই না। রাতে কিছুটা আসে। এলপিজি আর ইন্ডাকশন—দুটোই আছে, কিন্তু কোনোটা দিয়েই নিশ্চিন্তে রান্না করা যায় না।’

এই গল্প শুধু একটি পরিবারের নয়—রাজধানীর হাজারো পরিবারের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

গ্যাসের চাপ কম, আগুন টিমটিম: ভোগান্তির আরেক চিত্র

নীলক্ষেত এলাকার ফটোকপিয়ার দোকান মালিক শাহজাহান মিয়া প্রতিদিন দুপুরে আজিমপুরের বাসায় খাবার খেতে যান। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে বাসায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে চুলায় টিমটিম করে আগুন জ্বলে।

তিনি বলেন, ‘গ্যাসের চাপ এত কম যে রান্না করতে করতে বিকেল হয়ে যায়। অনেক সময় খাবার ঠিকমতো সিদ্ধও হয় না।’

এলপিজির দামে ‘আগুন’, নাগালের বাইরে জ্বালানি

কলাবাগানের বাসিন্দা হাশেম মিয়া জানান, সরকার ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে বাস্তবতা ভিন্ন।

তার ভাষায়, ‘২ হাজার ১০০ টাকার নিচে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। কোথাও কোথাও ২ হাজার ২০০ টাকাও নিচ্ছে। ফলে বিকল্প জ্বালানি হিসেবেও এলপিজি এখন অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে গেছে।’

ত্রিমুখী সংকটে নগরজীবন

ঢাকার গৃহস্থালিতে জ্বালানি সংকট এখন তিন দিক থেকে আঘাত করছে—

পাইপলাইনে গ্যাস সংকট

দৈনিক চাহিদার তুলনায় বড় ঘাটতির কারণে দিনের বেলায় অধিকাংশ এলাকায় গ্যাস থাকে না; রাতে সীমিত সরবরাহ পাওয়া যায়।

এলপিজির উচ্চমূল্য

সরকারি নির্ধারিত দাম থাকলেও খুচরা বাজারে অতিরিক্ত ৩০০–৫০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।

লোডশেডিংয়ের বাড়তি চাপ

গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎনির্ভর রান্নাও মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ব্যাহত হচ্ছে।

গ্যাস বন্ধের নতুন ঘোষণা, বাড়ছে শঙ্কা

এর মধ্যেই নতুন করে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে গ্যাস সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা। আগামী ১০ এপ্রিল সকাল ৮টা থেকে ১১ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত আশুলিয়া, সাভার, বাইপাইলসহ বিস্তীর্ণ শিল্প ও আবাসিক এলাকায় গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।

ঘোষণায় বলা হয়, এই সময়ে আশপাশের এলাকাতেও গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করতে পারে। ফলে রাজধানী ও এর উপকণ্ঠের লাখো মানুষকে নতুন করে ভোগান্তিতে পড়তে হবে।

নারীদের ওপর বাড়তি চাপ

এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন গৃহিণীরা। গ্যাসের অপেক্ষা, বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং অনিশ্চিত সময়সূচির কারণে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা শ্রম দিতে হচ্ছে তাদের।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) গবেষণায় দেখা গেছে, এটি একটি বড় সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। অনিয়মিত খাবার, রাত জেগে রান্না এবং পারিবারিক চাপের কারণে নারীদের মধ্যে গ্যাস্ট্রিক, মাথাব্যথা ও হরমোনজনিত সমস্যা বাড়ছে।

সংকটের মূলে কী?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ—

গ্যাস উৎপাদন ও আমদানিতে ঘাটতি তিতাস গ্যাসের সিস্টেম লস ও অবৈধ সংযোগ আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন বাজার তদারকির দুর্বলতা মানসিক চাপের অদৃশ্য সংকট

গবেষণায় দেখা গেছে, জ্বালানি সংকট এখন শহুরে পরিবারের মানসিক চাপের অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, অনিশ্চিত সরবরাহ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যাঘাত—সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য চাপ তৈরি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

সমাধানের পথ কোথায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট নিরসনে জরুরি পদক্ষেপগুলো হলো—

অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এলপিজির বাজারে কঠোর তদারকি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গৃহস্থালি খাতে গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতিতে সংস্কার

শেষ কথা

ঢাকার গৃহস্থালিতে জ্বালানির এই ত্রিমুখী সংকট এখন এক গভীর মানবিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। মনোয়ারা বেগম, শাহজাহান মিয়া কিংবা হাশেম মিয়াদের মতো অসংখ্য পরিবারের প্রতিদিনের একটাই প্রশ্ন—‘আজ রান্না হবে তো?’এ প্রশ্নের উত্তর যতদিন অনিশ্চিত থাকবে, ততদিন নগরজীবনের স্বস্তিও অধরাই থেকে যাবে।

এমইউ/বিএ