ভূমি দস্যুতা, প্রতারণা ও জালিয়াতি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের একাধিক অভিযোগে কক্সবাজার সদরের কলাতলীর আলোচিত বেলায়ত হোসেনকে (৩৬) অবশেষে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) কক্সবাজারের দ্রুত বিচার আদালতের বিচারক আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ তাকে ভাইসহ কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বলে জানিয়েছেন আদালতের বেঞ্চ সহকারি আবদুর রহিম।
কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আরও একজন হলেন বেলায়েতের ভাই শহিদুল ইমরান বাপ্পি (২৬)। বেলায়েত কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের আদর্শগ্রাম এলাকায় বসবাসকারি মহেশখালীর সিরাজ আহমদের ছেলে।
বেলায়েতের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর থানায় প্রতারণা, জালিয়াতি ও দ্রুত বিচার আইনে অন্তত ৯টি মামলা রয়েছে। এছাড়া আদালতে আরও ডজনাধিক মামলা বিচারাধীন বলে জানিয়েছে পুলিশ ও আদালত সূত্র।
বেলায়েতের কাছে ভুক্তভোগী সুলতান মেহেদী হাসানের আইনজীবী বাপ্পি শর্মা জানান, ঝিলংজার কলাতলী এলাকায় গোলাম হাসান নামে এক সার্ভেয়ারের বন্দোবস্তি নেওয়া এক একর ২৭ শতক জমি জবরদখলে বেলায়েত ভূয়া কাগজে একাধিক মামলা করে। বেলায়েত কর্তৃক এডিএম আদালতে করা একটি মামলায় উভয়পক্ষকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করে শান্তিমতো থাকতে বলা হয়। কিন্তু ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর হঠাৎ বেলায়েত ও তার ভাই বাপ্পী এবং স্ত্রীর নেতৃত্বে চলা নারী বাহিনী দিয়ে প্রয়াত গোলাম হাসানের ছেলে সুলতান মেহেদী হাসানের প্লটের নিরাপত্তা দেয়াল ভেঙ্গে ফেলে (যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে)। আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলানোর ঘটনায় দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়। এ মামলায় ৯ এপ্রিল জামিন শুনানি শেষে প্রধান আসামি বেলায়েত হোসেন ও তার ভাই বাপ্পীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন দ্রুত বিচার আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এক সময়ে কক্সবাজার গণপূর্ত অধিদপ্তরে মাস্টার রুলে দারোয়ান হিসেবে কাজ করা মহেশখালীর বাসিন্দা সিরাজ আহমদের ছেলে বেলায়ত দীর্ঘদিন ধরে জালিয়াতি ও ভূমিদস্যুতায় কলাতলী ও ঝিলংজায় ‘ল্যান্ড লর্ড’ হিসেবে পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। জমি কেনাবেচার তথ্য পেলেই বেলায়ত চক্র ভুয়া দলিল তৈরি করে মামলা দায়ের করে। এতে প্রকৃত মালিকরা আইনি জটিলতায় পড়ে শেষ পর্যন্ত আপস করতে বাধ্য হন, বলে উল্লেখ করেন স্থানীয়রা।
তারা আরও জানান, পিবিআই কক্সবাজার কার্যালয়ের জমি অধিগ্রহণের টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে তুলে নেওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় কারান্তরীণ হন বেলায়েত চক্র। পরে জামিনে বের হয়ে এসে আরও বেপরোয়া হন বেলায়েত। একের পর এক জমিতে ঝামেলা তৈরি করে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। লালন করে টোকাই বাহিনী, নারী অপরাধী দল। তার চক্রে রয়েছে আইনজীবী, ক্লার্ক, সরকারি বিভিন্ন বিভাগের চতুর্থ ও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারি, বিভিন্ন এলাকার দাগী আসামি ও চিহ্নিত ভূমিদস্যুরা। এ কারণে তার বিরুদ্ধে কেউ কোথাও পরিত্রাণ পেত না। অপরাধ করে- চক্রের আইনজীবী, ক্লার্ক ও অন্যদের সহায়তায় ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। তখন অসহায়ের মতো, সবাই আত্মসমর্পণ করেছে এতদিন।
স্থানীয় কফিল নামে আরেক ভুক্তভোগী দাবি করেন, পর্যটন এলাকার ফাঁকা বা বিরোধপূর্ণ জমি টার্গেট করে বেলায়ত ও তার চক্র ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে মামলা জটিলতা সৃষ্টি করে। এতে প্রকৃত মালিকরা হয়রানির শিকার হয়ে অনেক সময় আপস বা জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
স্থানীয় সমাজের প্রধান ব্যক্তিদের মতে, ২০১৯ সালের কোভিড পরিস্থিতির সময় পিবিআইয়ের জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে বেলায়েত চক্র। এরপর থেকে একের পর এক ভূমি দস্যুতা করে আসছে বেলায়েত।
কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেলার দেলোয়ার হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে অন্য হাজতিদের সঙ্গে কারাগারে পৌঁছেছেন বেলায়েত ও বাপ্পী। আপাতত দস্যুতাসহ দ্রুত বিচার আইনের মামলায় কারাগারে আনা হয়েছে তাদের।
সায়ীদ আলমগীর/এনএইচআর/জেআইএম