‘ইসমাইল মাঝি কারো জন্য মামলা করে না। কারো আতাই (দিয়ে) সালিশ করে না। নিজের সালিশ নিজে করে। নিজের বিচার নিজে করে। মাপ করলেও নিজে করে। আর জীবনে এগিন কইরতাননো (করবো না)। মাঝির যা ক্ষতিপূরণ এখন দিয়া যামু। ইসমাইল মাঝির লগে এই কাম করিস না কেউ।’ বেত্রাঘাতের পর এভাবেই ইসমাইলের বলা কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করছিলেন কালু।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে দোকানের আঁড়ার সঙ্গে বেঁধে মো. কালু নামে ইটভাটার এক শ্রমিককে পেটানোর ভিডিও সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ইসমাইল হোসেন নামে ইটভাটার এক মাঝি ঘটনাটি ঘটিয়েছে। ভিডিওতে ইসমাইলের বলা কথাগুলো কালুকে দিয়ে বারবার পুনরাবৃত্তি করানো হয় এবং তাকে পেটাতে দেখা যায়।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বিকেলে উপজেলার তোরাবগঞ্জ ইউনিয়নের মৌলভিরহাট এলাকার স্লুইসগেট এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ৬ মিনিট ১৩ সেকেন্ডের ভিডিওটি প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। ভাইরাল ভিডিওটি দেখে স্থানীয় লোকজন অভিযুক্ত ইটভাটা মাঝির বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
ভিডিওর শেষ ভাগে শোনা যায়, ‘মাঝি আগা গোড়া চেচি হালা। বাবারে ভাইরে তোরা এইমিলে ব্রিকফিল্ড থেকে না কইয়া আইছ নারে ভাই। মাঝি টাকা দেয় তোরা ঠিকমতো কাম কর ভাই। আমার মতো কেউ ভুল করিসনারে ভাই। মাঝি ঠিকমতো টিয়া টাকাল দেয়, ঠিকমতো কাজ করবিরে ভাই। ভাই তোরা কেউ ছুটিতে আইলে বেশিদিন থাইছ না। ছুটিতে আইলে ৫-৬ দিন থাকি চলি যাবি ভাই।’
এভাবে ইসমাইল কথাগুলো কালুকে দিয়ে বলিয়ে নেয় এবং আঘাত করে। ‘আর জীবনে কইরবিনি এগিন- এ কথা বলেই ইসমাইল তার পায়ে ও পাছায় এলোপাতাড়ি পেটায়। এ সময় কালু বলে আর জীবনে করুম না। ভাই তোরাও কুনুগা জীবনে করিস না। ব্রিকফিল্ডেরতন না কই আইছ না। আইলে সুন্দর মতো চলি যাইস। আই আয় অন শাস্তি হাইতাছি। তোরা কেউ আর মতো আইছ নারে ভাই’।
ভুক্তভোগী কালু কমলনগর উপজেলার চরকাদিরা ইউনিয়নের চরবসু বাদামতলী বাজার এলাকার বাসিন্দা। অভিযুক্ত ইসমাইলের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। তিনি ইটভাটায় শ্রমিক সরবরাহ করেন।
৬ মিনিট ১৩ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, কালু নামে ওই শ্রমিকের দুইহাত দোকানঘরের আঁড়ার সঙ্গে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে বাঁধা হয়। এরপর ইসমাইল মাঝি একটি লাঠি হাতে ওই শ্রমিককে পেটাচ্ছেন। এ সময় শ্রমিককে উদ্দেশ্য করে অকথ্য ভাষায় গালাগাল দেওয়া হয়। পেটানোর মাঝে তাকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিজ্ঞা করানো হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ৮০ হাজার টাকায় চট্টগ্রামের একটি ইটভাটায় কাজ করার জন্য ইসমাইলের সঙ্গে কালু চুক্তিবদ্ধ হয়। তিনি টাকাও নিয়েছেন। সে অনুযায়ী তিনি চট্টগ্রামের ইটভাটার শ্রমিকের কাজ করতো। কিছুদিন আগে কালু অসুস্থতার কারণে বাড়িতে চলে আসে। এরপর তিনি শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান নেয়। ঘটনার সময় কালুকে তার শ্বশুরবাড়ি থেকে ইসমাইল লোকজন নিয়ে তাকে ধরে আনে। পরে ঘটনাস্থলে ইসমাইলের অফিসে (দোকানঘর) দুই হাত বেঁধে নির্যাতন করে এবং ভয়ভীতি দেখায়।
পরে কালুর পরিবর্তে তার ভাইদের দিয়ে কাজ করে দিতে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়। কালু অসুস্থ হয়ে পড়লে বাড়াবাড়ি করবে না বলে সাদা কাগজে মুচলেকা নিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
কালু মিয়া বলেন, ইসমাইল মাঝি আমাকে তার লোকজন দিয়ে ধরে নিয়ে হাত বেঁধে মারধর করে। পরে আমার বাড়িতে খবর দেয় এক লাখ টাকা নিয়ে আসার জন্য। মারধরের ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হলে পুলিশ আমাকে উদ্ধার করে। মাঝি পালিয়ে গেছে।
ইসমাইল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, চট্টগ্রামের একটি ইটভাটায় কাজের জন্য কালুকে বছরের শুরুতে ৮০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু সে কাজ করছে না। প্রায়ই নানা অজুহাতে কাজ ফেলে চলে আসে। দুইহাত বেঁধে ঝুলিয়ে রাখলেও বেশি মারধর করা হয়নি। ভয় লাগানোর জন্য সামান্য কয়েকটি বেত্রাঘাত দিই।
এ ব্যাপারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বলেন, ভিকটিমকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। অভিযুক্তকে ধরার চেষ্টা অব্যাহত।
কাজল কায়েস/এমআরএম