ক্যাম্পাস

রঙে রঙে সাজছে চারুকলা, অপেক্ষা নববর্ষের

পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে দিন-রাত এক করে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিক্ষার্থী-শিল্পীরা। রং, কাগজ, বাঁশ আর কাপড়ে ফুটে উঠছে নতুন বছরের উচ্ছ্বাস, প্রত্যাশা আর সাংস্কৃতিক চেতনার বহুমাত্রিক প্রকাশ।

নতুন বছর বরণ করে নিতে এবারের শোভাযাত্রার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐক্যতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। এই ভাবনা ধারণ করেই নির্মিত হচ্ছে শোভাযাত্রার প্রতিটি উপকরণ। লোকজ ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা সামনে রেখে এবার পাঁচটি প্রধান মোটিফ বিশেষভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

চারুকলা প্রাঙ্গণে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক জীবন্ত কর্মযজ্ঞ। কোথাও বিশাল মুখোশে রঙের প্রলেপ দিচ্ছেন কেউ, কোথাও বাঁশের কাঠামো দাঁড় করানো হচ্ছে, আবার কোথাও কাগজ-কাপড়ের সূক্ষ্ম কাজে শেষ ছোঁয়া দিচ্ছেন শিল্পীরা। বাঘ, পাখি, মাছসহ নানা প্রতীকী মোটিফ যেন ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে তাদের তুলির আঁচড়ে।

এবারের আয়োজনে পাঁচটি প্রধান মোটিফে একসঙ্গে ধরা দিয়েছে বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সময়ের বার্তা। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় আকর্ষণ বিশালাকৃতির লাল ঝুঁটিওয়ালা মোরগ। পাশাপাশি রংতুলির আঁচড়ে বিভিন্ন দৃশ্য ফুটিয়ে তুলছেন শিল্পীরা। পটচিত্র বাংলাদেশ, গাজীরপট, পটচিত্র আকবর, পটচিত্র বনবিবি, পটচিত্র বেহুলা নামে ভিন্ন ভিন্ন পটচিত্র এঁকেছেন শিল্পীরা।

চারুকলার সাবেক শিক্ষার্থী শিল্পী হোসাইন আহমেদ সহজভাবে বলেন, লাল ঝুঁটিওয়ালা মোরগটা আসলে নতুন ভোর আর জেগে ওঠার প্রতীক। অন্ধকার পেরিয়ে আলোর দিকে যাওয়ার একটা বার্তা দেয় এটা। দোতারা আমাদের লোকসংগীতের অংশ, এটা দেখলে নিজের সংস্কৃতি আর শিকড়ের কথা মনে পড়ে। একই সঙ্গে বাউল আর লোকশিল্পীদের যে প্রাপ্য সম্মান, সেটার কথাও মনে করিয়ে দেয়।

তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের লোকশিল্প জাদুঘরের আদলে বানানো কাঠের হাতিটা ঐতিহ্য, শক্তি আর আভিজাত্য তুলে ধরে। টেপা আকৃতির ঘোড়াটায় গ্রামবাংলার সহজ-সরল জীবন আর ছোটবেলার স্মৃতি দেখা যায়। আর শান্তির পায়রাটা সম্প্রীতি, একসাথে থাকার ভাবনা আর বিশ্বশান্তির বার্তা দেয়, যার কারণে পুরো আয়োজনটা আরও মানবিক আর সবার জন্য হয়ে উঠেছে।

মোটিফগুলোর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে চারুকলা অনুষদের ডিন ও নববর্ষ উদযাপন কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, এবারের শোভাযাত্রা নতুন সূচনা, ঐতিহ্য এবং সামাজিক প্রত্যাশা একসূত্রে গেঁথে উপস্থাপন করছে।

তার মতে, মোরগের পেছনে যুক্ত লাল সূর্য নতুন দিনের আশা ও গণতান্ত্রিক পুনরুত্থানের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করে।

চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী সামিয়া হক বলেন, সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কাজের চাপ। তবুও ক্লান্তি ভুলে সবাই কাজ করে যাচ্ছেন, যেন এবারের শোভাযাত্রা হয় আরও বর্ণিল ও অর্থবহ।

তিনি বলেন, এটি একটি উৎসবের সঙ্গে বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামষ্টিক চেতনাকে তুলে ধরার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

চারুকলার এই সৃজনশীল ব্যস্ততার পাশাপাশি বকুলতলায় বসেছে সাংস্কৃতিক আসর। সেখানে গানের সুর, কবিতা আবৃত্তি আর আড্ডায় জমে উঠেছে উৎসবের আবহ। লোকগান ও বৈশাখী সুরে মুখর হয়ে উঠছে পুরো এলাকা।

এই আয়োজন দেখতে ভিড় করেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। কেউ ঘুরে ঘুরে মোটিফ দেখছেন, কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটাচ্ছেন। ক্যাম্পাসজুড়ে উৎসবের এই উচ্ছ্বাসে যোগ দিয়েছে দর্শনার্থীদের সরব উপস্থিতি।

শ্যামলী জাহান নামে এক দর্শনার্থী বলেন, চারুকলার এই আয়োজনের জন্য সারাবছর অপেক্ষা করি। এই আয়োজনে আমরা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে অংশগ্রহণ করতে পারি। সবাই নতুন বছরকে স্বাগত জানাই। এই যে দেখেন- সবাই যেভাবে এখানে নতুন বছরের আগমন গ্রহণ করতে উদগ্রীব হয়ে আছে, তা আর অন্য কোথাও পাবেন না।

এদিকে সরেজমিনে দেখা যায়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পাসে মোতায়েন রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্তরিকভাবে কাজ করছে। আমাদের প্রক্টরিয়াল টিম ও আমরা নিজেরাও যতটুকু সম্ভব সতর্কতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, আমাদের কাজ প্রায় শেষ। নিরলসভাবে এখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা রাতদিন কাজ করছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আমাদের কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি।

সবমিলিয়ে চারুকলা অনুষদে এখন শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা আর উৎসবের উচ্ছ্বাস একাকার। রং, সুর আর সৃজনশীলতার মেলবন্ধনে প্রস্তুত হচ্ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব- ‘পহেলা বৈশাখ’।

এদিকে নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিছু নির্দেশনা জারি করেছে। সেগুলো হলো-

পহেলা বৈশাখে ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের মুখোশ পরা ও ব্যাগ বহন নিষিদ্ধ, তবে চারুকলা অনুষদের তৈরি মুখোশ হাতে প্রদর্শন করা যাবে। ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো ও বিক্রিতেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সব অনুষ্ঠান বিকেল ৫টার মধ্যে শেষ করতে হবে এবং এরপর ক্যাম্পাসে প্রবেশ বন্ধ থাকবে।

নিরাপত্তার স্বার্থে নববর্ষের দিন ক্যাম্পাসে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে, মোটরসাইকেল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার পর স্টিকারযুক্ত গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কিছু গেট বন্ধ রাখা হবে এবং নির্ধারিত গেট দিয়ে প্রবেশ ও প্রস্থান করতে হবে। এছাড়া টিএসসি এলাকায় হেল্পডেস্ক, কন্ট্রোল রুম ও অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প থাকবে এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে মোবাইল টয়লেট স্থাপন করা হবে।

এফএআর/বিএ