বিনোদন

মস্কোর সিনেমা উৎসবে যাত্রাশিল্পীদের নিয়ে যাচ্ছেন আসিফ

এই খবর যখন খুলছে পাঠকের মুঠোয়, ততক্ষণে মস্কো পৌঁছে গেছে বাংলার যাত্রাশিল্পের শেষ প্রতিনিধিদের অভিনীত সিনেমাটি। খবরটি যখন প্রকাশের অপেক্ষায়, নির্মাতা, প্রযোজক ও অভিনয়শিল্পী তখন মস্কোগামী বিমানের অপেক্ষায়। গর্বের সঙ্গে ‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ নিয়ে সিনেমার উৎসবে যাচ্ছেন তারা।

সদ্যই খবর এসেছিল ‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ ছবির নির্মাতার কাছে। ৪৮তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অফিসিয়ালি নির্বাচিত হয়েছে ছবিটি। ‘অক্টোবর সিনেমা’ ভেন্যুতে ১৮ এপ্রিল বিকেল ৩টায় ছবিটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার। তাতে অভিনয় করেছেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্পের শেষ প্রতিনিধিদের একটি দল।

ছবির নির্মাতা আসিফ ইসলাম জানান, ছবি সিলেকশনের সংবাদ পাওয়ার পর অরবিন্দ মজুমদারের জন্য আক্ষেপ হয়েছে তার। ওই উৎসবে এই যাত্রাশিল্পীকে নিয়ে যেতে পারলে তার জীবনে এক অন্যরকম প্রাপ্তি যোগ হতো। জাগো নিউজকে আসিফ ইসলাম বলেন, ‘অরবিন্দ দা’র বয়স অনেক। এত দ্রুততম সময়ে সবকিছু হলো যে, তাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। কিন্তু খুব ইচ্ছে ছিল।’

‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ ছবিটি তুলে ধরে বাংলা লোকনাট্য যাত্রাপালার ক্রমবর্ধমান অবক্ষয়। সেখানে ‘প্রিন্সেস’, এক আবেদনময়ী নৃত্যশিল্পী, যে ধীরে ধীরে মঞ্চ দখল করে নেয় আর বদলে দেয় শিল্পের ভাষা। আসিফ জানান, এই চলচ্চিত্র আমাদের সমাজের আয়না, যা প্রশ্ন তোলে— বিনোদনের নামে এখন আমরা আসলে কী করছি ।

এই ধুন্ধুমার সিনেমা বাণিজ্যের কালে কেন এমন সিনেমা? জানতে চাইলে আসিফ ইসলাম বলেন এক দীর্ঘ অভিজ্ঞতার গল্প। তিনি বলেন, ‘যাত্রার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল শৈশবে, ঢাকার প্রান্তবর্তী একটি দুর্গাপুজোর মেলায়। বর্ণময় আলো, সুরের মায়া, আর রঙিন সাজসজ্জা আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সেই অভিজ্ঞতা আমার গল্প বলার ধারণাকে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। ২০১৮ সালে, বহু বছর পর আবারও যাত্রা দেখার সুযোগ হয়। সেই রাতের পালাটি ছিল “নবাব সিরাজউদ্দৌলা”। আশ্চর্যের বিষয়, এই যাত্রাপালাটিই আমি ৩৫ বছর আগে প্রথম দেখেছিলাম। কিন্তু এবার সবকিছু অন্যরকম মনে হলো। একসময়ের শক্তিশালী ও আবেগময় যাত্রার মঞ্চ এখন পরিণত হয়েছে প্রায় অ্যাডাল্ট নৃত্য-আসরে। দর্শকরা আজ আর কাহিনি দেখতে আসেননি। তাদের আকর্ষণ ছিল শহর থেকে আসা এক “প্রিন্সেস” নৃত্যশিল্পীকে ঘিরে। কয়েকটি দৃশ্যের পরেই যাত্রাপালা থেমে যায়, যখন প্রধান অভিনেতাকে দর্শকদের অপমানের মুখে পড়ে মঞ্চ ছাড়তে হয়।’

সেদিনের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে আসিফ বলেন, ‘সেই অস্বস্তিকর রাতেই আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করি, যাত্রা কীভাবে বদলে গেছে, কীভাবে সে টিকে থাকার লড়াই করছে এমন এক সময়ে, যখন ঐতিহ্য আর সময়ের চাহিদা এক নয়। আমি মনে করি, এই গল্পটি বলা জরুরি, শুধু স্মৃতির জন্য নয়, বরং যাত্রার ক্রমশ বিলীন হয়ে যাওয়া আত্মাকে ধারণ করার জন্য।’

আসিফ বলেন, “কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস” আমার সেই শীতের রাতটিকে পুনর্নির্মাণের একটি প্রচেষ্টা, একটি প্রতিবিম্ব, যেখানে আজকের যাত্রার ভঙ্গুর বাস্তবতা উঠে এসেছে। এই চলচ্চিত্রটি যে কারণে বিশেষ হয়ে উঠেছে— এখানে যাত্রাশিল্পীদের ভূমিকায় যারা অভিনয় করেছেন, তারা সকলেই বাস্তবের যাত্রাশিল্পী। তারা হয়তো যাত্রাশিল্পের শেষ প্রতিনিধিদেরই একটি দল। তাদের শিল্পকে এই সিনেমায় অন্তর্ভুক্ত করতে পেরে আমি ভীষণ গর্বিত। এ যেন যবনিকা টানার আগে তাদের জন্য শেষ এক মঞ্চ।’

‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ ছবিতে যাত্রা ধ্বংসের অন্যতম চরিত্র ‘প্রিন্সেস’ হিসেবে অভিনয় করেছেন আশনা হাবিব ভাবনা। উৎসবযাত্রা শেষ করার পর দেশে ছবিটি মুক্তির পরিকল্পনা সাজাবেন নির্মাতা ও প্রযোজক।

আরএমডি