দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা ছড়িয়ে পড়লেও কাঙ্ক্ষিত গতি ও গুণগত মান নিশ্চিত হয়নি। শহরেও হরহামেশা সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। ইন্টারনেটের তারের জঞ্জাল চোখের স্বস্তি দেয় না। তবে সরকারের সঠিক নীতিসহ ‘অ্যাক্টিভ শেয়ারিং’ চালু করলে দুই-তিন বছরের মধ্যেই তারের জঞ্জাল কমিয়ে আনা সম্ভব।
জাগো নিউজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদাতাদের সংগঠন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এমদাদুল হক তুহিন।
জাগো নিউজ: দেশের গ্রামগঞ্জে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবার গতি বাড়াতে আপনাদের পরিকল্পনা কী?মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম: গ্রামগঞ্জে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ছড়িয়ে দিতে প্রথমত সরকারের কাছে আমরা নীতিগত সহায়তা চাই। আমরা এখন সারাদেশে ‘এক দেশ এক রেট’-এ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ও ব্যান্ডইউথ সেবা দিচ্ছি। ঢাকা শহরের একজন গ্রাহক ৫০০ টাকায় যে ব্যান্ডউইথ পাচ্ছেন, প্রত্যন্ত ইউনিয়ন পর্যায়ের গ্রাহকও একই সেবা পাচ্ছেন। সরকার কিছু উদ্যোগ নিলেই ইন্টারনেটের দাম আরও কমানো সম্ভব।
সরকারের যে অব্যবহৃত ব্যান্ডউইথ রয়েছে, যেমন- ইনফো সরকার ১, ইনফো সরকার ২, ইনফো সরকার ৩, বিটিসিএল, পিজিসিবি এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের অব্যবহৃত ক্যাপাসিটিগুলো সমন্বয় করে একটি ফাইবার ব্যাংক কিংবা কমন অ্যাক্সেস নেটওয়ার্ক তৈরি করে। আমরা যারা রিটেইল কিংবা অ্যাক্সেস নেটওয়ার্ক লেভেলের ব্যবসা পরিচালনা করছি, তাদের যদি সাশ্রয়ীমূল্যে ইন্টারনেট ট্রান্সমিশনটা প্রোভাইড করে, তাহলে গ্রাহক আরও কমমূল্যে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা পাবে। এটি সম্ভব হলে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও ঢাকাসহ সারাদেশে আরও সাশ্রয়ীমূল্যে ইন্টারনেট দিতে পারবো বলে আমরা আশা করছি।
মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম: বিটিআরসির ‘কোয়ালিটি অব সার্ভিস’ নির্দেশনা অনুযায়ী দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে গ্রাহককে বিল সমন্বয় করে দেওয়া হয়। যদি তিন থেকে পাঁচদিনের মতো দীর্ঘ সময় সেবা বন্ধ থাকে, তাহলে মাসিক বিল থেকে সমন্বয় করা হয়। আর স্বল্প সময়ের সমস্যার ক্ষেত্রে অনেক আইএসপি বিলিং পিরিয়ডে কিছুটা সমন্বয় করে দেয়। বিষয়টি এরই মধ্যে হচ্ছে।
জাগো নিউজ: সারা দেশে ইন্টারনেট সেবায় একক কলরেট কার্যকর হচ্ছে না কেন? এমবিপিএস কারও বেশি, কারও কম কেন?মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম: বিটিআরসি একটি ‘ফ্লোর প্রাইস’ নির্ধারণ করে দিয়েছে, তবে সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেনি। এজন্য প্রতিযোগিতার কারণে অনেক আইএসপি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি গতির ইন্টারনেট দিচ্ছে। যেমন, ৫০০ টাকায় ১০ এমবিপিএস দেওয়ার কথা থাকলেও অনেকেই ২০ থেকে ২৫ এমবিপিএস পর্যন্ত দিচ্ছে।
জাগো নিউজ: বৃষ্টি বা বজ্রপাত হলেই লাইন থাকে না। উন্নত দেশগুলোতে কিন্তু এই সমস্যা নেই। আপনাদের এটা নিয়ে কোনো ভাবনা আছে কি না?মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম: একই এলাকায় একাধিক আইএসপি আলাদা আলাদা ক্যাবল স্থাপন করে। এতে নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ঝড়-বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে সংযোগ সহজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে ‘অ্যাক্টিভ শেয়ারিং’। এতে একটি অবকাঠামো ব্যবহার করে একাধিক অপারেটর সেবা দিতে পারবে। ধানমন্ডিতে পরীক্ষামূলকভাবে এই পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। সেখানে একটি ক্যাবলের মাধ্যমে প্রায় ১০০টি আইএসপি সেবা দিচ্ছে। এতে ডাউনটাইম প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে এবং গ্রাহক অপারেটর পরিবর্তন করলেও নতুন করে ক্যাবল লাগাতে হচ্ছে না।
জাগো নিউজ: সারাদেশে ব্রডব্যান্ডের ঝুলন্ত ক্যাবল। এটি জঞ্জাল তৈরি করছে। ক্যাবল অপসারণ নিয়ে কী ভাবছেন?মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম: ঝুলন্ত তার কমানো কিংবা অপসারণের জন্য আমরা বিটিআরসিকে মৌখিক ও লিখিতভাবে অনুরোধ করেছি। এটি করার জন্য আমাদের যেন অ্যাক্টিভ শেয়ারিংটা অ্যালাউ করা হয়। অ্যাক্টিভ শেয়ারিং অ্যালাউ হলে- ১০টি, ৫০টি কিংবা ১০০টি আইএসপি মিলে কিছু আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল করে ফেলতে পারি, তাহলে লাস্ট মাইলে একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারবো। সেক্ষেত্রে ঝুলন্ত তার কমে যাবে।
নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে ইন্টারনেটের দাম বাড়বে ২০ শতাংশসারাদেশে একই দামে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটদাম না বাড়িয়ে ইন্টারনেটের গতি তিনগুণ করলো বিটিসিএলইন্টারনেটের দাম কমালো সবাই, বাকি ৩ মোবাইল অপারেটর
অ্যাক্টিভ শেয়ারিংয়ের জন্য বিটিআরসি থেকেও একটা নীতিমালা প্রণয়ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেই আলোকে বিটিআরসি গত তিন থেকে চারদিন আগে অ্যাক্টিভ শেয়ারিংয়ের নীতিমালায় কী কী থাকা উচিত, আমাদের কাছে মতামত চেয়েছে। আশা করছি, আগামী সপ্তাহের মধ্যে আমরা মতামত দিতে পারবো। হয়তো আগামী কিংবা পরবর্তী মাসের মধ্যে থেকে অ্যাক্টিভ শেয়ারিংয়ের নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারবে বিটিআরসি। তার ওপর ভিত্তি করে আমরা যদি কাজ শুরু করি, আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে এই ঝুলন্ত তার অপসারণ করা সম্ভব হবে।
জাগো নিউজ: ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবায় এখনো পেশিশক্তির ব্যবহার দেখা যায়। এটি নিয়ে কী বলবেন?মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম: এর কারণ হচ্ছে মনিটরিংয়ের দুর্বলতা। এ ব্যবসায় বিটিআরসির লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। দেখা যায় দেশের অনেক জায়গায় নন-লাইসেন্সিরা এই ব্যবসাটা পরিচালনা করছে। নন-লাইসেন্সিরা ব্যবসা যখনই পরিচালনা করে, তখন তাদের জবাবদিহি থাকে না ও পেশিশক্তির একটা ব্যাপার চলে আসে। এক্ষেত্রে বিটিআরসির মনিটরিং বাড়াতে হবে ও ইন্ডাস্ট্রি থেকেও আমাদের মনিটরিং বাড়াতে হবে। পেশিশক্তির কথা সত্যিকার অর্থে যদি বলি, সত্যভাবে বলি, সারা দিনে কিংবা সারা বছরে ১০০টি অভিযোগ আসে, ৯৮ শতাংশই দেখা যায় নন-লাইসেন্সিদের।
জাগো নিউজ: ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী আপনাদের?মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম: বর্তমানে দেশে ব্রডব্যান্ড পেনিট্রেশন (প্রবেশ হার) রেট ৭ থেকে ৮ শতাংশের মতো। আমরা চাই আগামী তিন বছরে এটি ৫০ শতাংশে উন্নীত হোক এবং পাঁচ বছরের মধ্যে শতভাগ কাভারেজ নিশ্চিত করা সম্ভব হোক।
জাগো নিউজ: সারাদেশকে ব্রডব্যান্ড সেবার আওতায় আনতে কোন ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে?মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম: আমাদের ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক সারাদেশে সেভাবে পৌঁছায়নি। আর অ্যাক্সেস নেটওয়ার্ক যেটা আছে, অ্যাক্টিভ শেয়ারিং না থাকায় প্রচুর বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু সেই বিনিয়োগের ফিজিবিলিটি থাকে না। তো ইনভেস্টমেন্ট যখন ফিজিবল হয় না, তখন প্রতি বাসায় বাসায় ক্যাবলটা পৌঁছায় না। সরকার যখন আমাদের বলে দেবে লাস্ট মাইল কিংবা এক্সেস নেটওয়ার্কের কেবলিংটাতে অ্যাক্টিভ শেয়ারিং দেওয়া হলো, তখন ইন্ডাস্ট্রি থেকে দেখা গেলো সিঙ্গেল ক্যাবলে প্রতিটা বাসায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব আরও অল্প ইনভেস্টমেন্টে। এ খাতের জন্য অ্যাক্টিভ শেয়ারিং চালু করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
জাগো নিউজ: অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে করা এ খাতের বিভিন্ন নীতিমালা নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী? নতুন সরকারের সঙ্গে আপনাদের আলোচনার অগ্রগতি কতদূর?মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম: অন্তর্বর্তী সরকার টেলিকম পলিসি-২০২৫ করেছে। তখন সরকারের সঙ্গে আমরা আলোচনা করেছি। কিছু বিষয় আমাদের মতো হয়েছে, কিছু বিষয় হয়নি। যে ক্লজগুলিতে আমাদের অবজারভেশন আছে, সেই ক্লজগুলো নিয়ে আমরা নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে ডায়ালগ শুরু করেছি। সরকার আমাদের আশ্বস্ত করেছে যে- অ্যামেন্ডমেন্টটা কিংবা টেলিকম পলিসি ২০২৫ রিভিউ হলে, সেই রিভিউয়ের আগে আমাদের স্টেকহোল্ডার সঙ্গে মিটিং করবে। আমাদের বক্তব্য ও দাবি-দাওয়া শোনা হবে। সেই অলোকে তাতে কিছু পরিবর্তন আনা হবে। নীতিমালায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এলে ব্রডব্যান্ড খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছি।
ইএইচটি/এএসএ/এমএফএ