ফিচার

সম্রাট আকবরের শাসনামলে হালখাতার নাম কী ছিল জানেন?

মির্জা ফারিহা ইয়াসমিন স্নেহাবাঙালির চিরায়ত উৎসব পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন শুধু উৎসবের আমেজেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক ঐতিহ্য ‘হালখাতা’। শতাব্দী প্রাচীন এই প্রথা আজও সমান গুরুত্বে পালন করে আসছেন দেশের ব্যবসায়ীরা, যদিও সময়ের সঙ্গে এর রূপে এসেছে নানা পরিবর্তন।

হালখাতার অর্থ

‘হালখাতা’ শব্দটির উৎপত্তি ফারসি ভাষা থেকে; ‘হাল’ অর্থ নতুন এবং ‘খাতা’ অর্থ হিসাবের বই। অর্থাৎ, বছরের প্রথম দিনে পুরোনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে নতুন খাতা খোলার মধ্য দিয়েই শুরু হয় নতুন অর্থবছরের যাত্রা। এদিন ব্যবসায়ীরা তাদের খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানান, পুরোনো দেনা পরিশোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং মিষ্টিমুখের মাধ্যমে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেন।

মোগল সম্রাট আকবরের আমলে হালখাতার নাম ছিল ‘পুণ্যাহ’

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা সনের প্রবর্তন করলে এর পরপরই হালখাতার প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তীতে বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ‘পুণ্যাহ’ নামে একটি রীতি চালু করেন, যা মূলত খাজনা আদায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। সেই ধারাবাহিকতা থেকেই ব্যবসায়িক হালখাতার প্রচলন বিস্তৃত হয়। কালের বিবর্তনে ‘পুণ্যাহ’ বিলুপ্ত হলেও হালখাতার ঐতিহ্য টিকে আছে আজও।

প্রথমদিকে এই প্রথা বাঙালি মুসলমান ব্যবসায়ীদের মধ্যেই বেশি প্রচলিত ছিল। তারা নতুন খাতার প্রথম পাতায় ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ ও ‘এলাহি ভরসা’ লিখে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে বছরের শুভ সূচনা করতেন। অন্যদিকে, সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখের সকালে সিদ্ধিদাতা গণেশ ও লক্ষ্মী দেবীর পূজা করে নতুন হিসাব শুরু করেন। ধর্মীয় ভিন্নতা থাকলেও উদ্দেশ্য এক নতুন বছরে ব্যবসার সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনা।

হালখাতার বর্তমান

গ্রাম থেকে শহর বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট-বড় সব ধরনের দোকানেই এখনো হালখাতা পালিত হয়। এদিন দোকানগুলোতে থাকে উৎসবমুখর পরিবেশ, ক্রেতাদের জন্য মিষ্টান্ন ও ঠান্ডা পানীয়ের আয়োজন, আর আন্তরিক আপ্যায়নের মাধ্যমে তৈরি হয় সৌহার্দ্যের সেতুবন্ধন।

তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে হালখাতার চিরচেনা রূপেও এসেছে পরিবর্তন। একসময় যেখানে মোটা খাতায় হাতে লেখা হিসাবই ছিল প্রধান মাধ্যম, সেখানে এখন অনেক ব্যবসায়ী কম্পিউটার ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটালভাবে হিসাব সংরক্ষণ করছেন। নিমন্ত্রণপত্রের জায়গায় এসেছে এসএমএস, ফোনকল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একইসঙ্গে বিকাশ, নগদ কিংবা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন হালখাতাকে আরও সহজ ও সময়োপযোগী করে তুলেছে।

গ্রামবাংলায় হালখাতা

তবে এই আধুনিকতার মাঝেও গ্রামবাংলার অনেক এলাকায় এখনো কাগজের খাতায় হিসাব লেখার পুরোনো রীতিই বহাল রয়েছে। ঐতিহ্য আর প্রযুক্তির এই সমন্বয়ই হালখাতাকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। হালখাতা শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রথা নয়; এটি বাঙালির সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও পারস্পরিক সম্পর্কের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা এই ঐতিহ্য আধুনিকতার ছোঁয়ায় নতুন রূপ পেলেও তার মূল চেতনায় আজও অটুট নতুনের আহ্বান, পুরোনোর পরিসমাপ্তি এবং সম্পর্কের নবায়ন।

আরও পড়ুননববর্ষ ও বর্ষ গণনার একাল-সেকালচৈত্রসংক্রান্তি: মর্মান্তিক ইতিহাস-হারিয়ে যাওয়া বাংলার উৎসব

কেএসকে