দেশজুড়ে

জ্বালানি সংকটে স্বস্তি দিচ্ছে জিকে ক্যানাল, কৃষকের মুখে হাসি

‌‘বোরো মৌসুমে শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি (সেচ) দিলে আমাদের পুষায় না। এবার ধান লাগানোর পর থেকেই ক্যানালে পর্যাপ্ত পানি রয়েছে। সেই পানি ব্যবহার করছি। ক্যানালের পানি ফসলে ব্যবহার করলে ভালো হয়। ফসলের রং গাঢ় সবুজ হয়। দীর্ঘসময় জমিতে পানি থাকে। জ্বালানি সংকটেও আমরা স্বস্তিতে রয়েছি।’

দেশব্যাপী যখন জ্বালানি সংকট চরম আকার ধারণ করেছে, তখন এভাবেই নিজের চাষাবাদ নিয়ে স্বস্তির কথা জানান চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কৃষক সেলিম মিয়া।

বর্তমানে চুয়াডাঙ্গায় জিকে (গঙ্গা-কপোতাক্ষ) প্রকল্পের পানিতে সেচ ক্যানাল পানিতে থৈ থৈ করছে। বিনা খরচে ক্যানালের পানি দিয়ে বোরো ধান, ভুট্টা ও সবজি আবাদ করছেন কৃষকরা। সেচ নিয়ে তাদের বেগ পেতে হচ্ছে না।

‘শ্যালো মেশিন দিয়ে পানিতে পুষায় না। একদিন পরপর মাঠের ফসলের জমিতে সেচ দিতে হয়। পানি না দিতে পারলে মাঠ শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে যায়। এ কারণে কৃষকরা জিকে ক্যানালের পানি ব্যবহার করে তাদের সেচকার্য চালিয়ে নিয়েছেন অনেকটা। এতে কৃষকের ভোগান্তিও কমেছে’

কৃষকরা বলছেন, ক্যানালের পানি দিয়ে ফসল চাষ করতে ফলন বৃদ্ধি পায়। বাড়তি খরচও গুনতে হয় না। পানি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হয় না। বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে কিছুটা ডিজেল সংকট থাকলেও জিকে ক্যানালের আওতায় কৃষকদের চাষ নিয়ে বর্তমানে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে না।

তারা জানান, বিগত কয়েক বছর খরা মৌসুমে ক্যানালে পানি না থাকায় কৃষকদের ডিজেল কিনে শ্যালো মেশিন (ইঞ্জিনচালিত) দিয়ে সেচ দিতে হতো। এখন তারা বিনা খরচে ক্যানালের পানি ব্যবহার করতে পারছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্দিষ্ট সময়ে কৃষকরা পানি পেয়েছেন।

বোরো ধান চাষে পানির ব্যবহার বেশি হয়। কারণ শুষ্ক মৌসুমে ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন দিয়ে পানিতে পুষায় না। একদিন পরপর মাঠের ফসলের জমিতে সেচ দিতে হয়। সেচ দিতে না পারলে মাঠ শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে যায়। এ কারণে কৃষকরা জিকে ক্যানালের পানি ব্যবহার করে তাদের সেচ কার্য চালিয়ে নিয়েছেন অনেকটা। এতে কৃষকের ভোগান্তিও কমেছে।

আরও পড়ুন: চুয়াডাঙ্গায় তুলা চাষে নীরব বিপ্লবরাজবাড়ীতে মধু সংগ্রহ করে মাসে আয় ৩ লাখ টাকাদুই জেলার ধানচাষিদের আশা জাগাচ্ছে জিকে সেচ প্রকল্পক্রুড সংকটে বন্ধ ইস্টার্ন রিফাইনারির মূল প্ল্যান্টআগামী দুই মাসেও দেশে জ্বালানি তেলের সংকট হবে নামালয়েশিয়া থেকে দুই জাহাজে এলো ৬৮ হাজার টন ডিজেল

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছরের গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পার্শ্ববর্তী জেলা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা জিকে সেচ প্রকল্প থেকে পানি ছাড়ে ক্যানালে। দুটি পাম্পের মাধ্যমে পদ্মা নদী থেকে পানি দেওয়া হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গার সব জিকে ক্যানালে এখন পানি আছে। ক্যানালে পানি আসার পরদিন থেকেই কৃষকরা তাদের ফসলি জমিতে সেচ দিতে শুরু করেন।

‘চলতি মৌসুমে চুয়াডাঙ্গা সদর ও আলমডাঙ্গা উপজেলায় সাত হাজার ৮০০ হেক্টর ফসলি জমি রয়েছে জিকে ক্যানালের আওতায়। আলমডাঙ্গায় ৫০০ হেক্টর ও সদর উপজেলায় ৬৫৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের জমিতে ক্যানালের পানি ব্যবহার হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ হচ্ছে। দুই উপজেলার ছয় হাজার ৫০০ জন কৃষক এ সুবিধার আওতায় রয়েছেন’

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা ও আলমডাঙ্গা উপজেলায় জিকে ক্যানাল রয়েছে। এই ক্যানালের আওতায় প্রধান খাল রয়েছে ৪১ কিলোমিটার, টারসিয়ারি খাল ২৬৩ কিলোমিটার, সেকেন্ডারি খাল ৭৫ কিলোমিটার ও মাঠনালা রয়েছে ২০ কিলোমিটার। ফসলের সেচের জন্য জিকে ক্যানালের পানি ব্যবহার করছেন কৃষকরা। ক্যানালে পানি থাকায় মাঠের শ্যালো মেশিনগুলোও কম ব্যবহার হচ্ছে।

চলতি মৌসুমে চুয়াডাঙ্গা সদর ও আলমডাঙ্গা উপজেলায় সাত হাজার ৮০০ হেক্টর ফসলি জমি রয়েছে জিকে ক্যানালের আওতায়। আলমডাঙ্গায় ৫০০ হেক্টর ও সদর উপজেলায় ৬৫৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের জমিতে ক্যানালের পানি ব্যবহার হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ হচ্ছে। দুই উপজেলার ছয় হাজার ৫০০ জন কৃষক এ সুবিধার আওতায় রয়েছেন।

আলমডাঙ্গা উপজেলার কৃষক সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘শ্যালো মেশিনে সেচ দিলে মেশিন ভাড়া আছে। অনেক সময় ধানও দিতে হয়। এতে আমাদের চাষাবাদের খরচ বেড়ে যায়। ক্যানালের পানি ব্যবহার করতে পারায় আমাদের এই বাড়তি খরচ লাগছে না। ক্যানালের পানি আয়রন ও আর্সেনিকমুক্ত।’

আরেক কৃষক নুর ইসলাম বলেন, ‘ক্যানালে এখনো পানি রয়েছে। যখন ইচ্ছা তখন পানি ব্যবহার করতে পারছি। ঝামেলা মুক্ত থেকে এ বছর চাষ শেষ করতে পারবো ভাবতেই পারেনি।’

এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘কৃষকরা পানি পেলে চাষে বেশি লাভবান হতে পারবেন। নির্দিষ্ট সময়ে জিকে কর্তৃপক্ষ পানি ছাড়লে সমস্যা দূর হবে। ক্যানালের আওতায় থাকা কৃষকরা তাদের ফসলে এ পানি ব্যবহার করতে পারবেন। এখান থেকে প্রয়োজনমতো পানি ব্যবহার করা যাবে।’

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পাম্প হাউজের মাধ্যমে জিকে ক্যানালে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানান চুয়াডাঙ্গা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফ আহমেদ।

তিনি বলেন, এ মৌসুমে কোনো ধরনের সমস্যা নেই। আমরা সবসময় কৃষকদের পাশে থাকার চেষ্টা করি। ক্যানাল দিয়ে ভালোভাবেই পানি আসছে।

এসআর/জেআইএম